মতামত || কেমন হলো তারেকের মন্ত্রিসভা?

মতামত || কেমন হলো তারেকের মন্ত্রিসভা?
শেয়ার করুন

হরিনারায়ণ দাস


৩৫ বছর পর বাংলাদেশ প্রথম একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেল। তবে এই প্রাপ্তিটা অনেকটা বংশ পরম্পরায় আসা। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পিতা ছিলেন সেনাশাসক ও ‘স্বনির্বাচিত’ রাষ্ট্রপতি, মা ছিলেন প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী- তিনি যেন উত্তরাধিকার সূত্রে পদটি পেলেন। বিগত দিনগুলোতে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করেছিল। নিষ্ঠুরভাবে প্রহৃত হবার পর ভবিষ্যতে আর রাজনীতি করবেন না এমন মুচলেকা লিখে তিনি দেশত্যাগ করেন। ১৮ বছর পর নতুন বাস্তবতায় দেশে ফিরে আসেন।

তবে ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান যে ধীর স্থির আচরণ দেখাচ্ছেন এবং বক্তব্যে যে উদারনৈতিক মনোভাব প্রকাশ করছেন, তাতে অনেকেই তার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে আশাবাদী হয়েছেন।

২০ বছর ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করল। মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা মিলে ৫৪ জনের মন্ত্রিপরিষদ ঘোষণা করেছে বিএনপি। এ মন্ত্রিপরিষদ গঠনে তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্তির ছাপ রেখেছেন। নবীণ প্রবীণের এক অপূর্ব কম্বিনেশন করেছেন তিনি। অনেক ত্যাগী নেতাকে তিনি মূল্যায়ন করেছেন। প্রয়াত নেতাদের মূল্যায়ন করেছেন তাদের উত্তরাধিকারদের মন্ত্রিপরিষদে স্থান দিয়ে। বিষয়টি বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

অনেকেই আশা করেছিলেন বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা আবু নছর মুহাম্মদ এহসানুল হক মিলনকে পূর্ণ মন্ত্রিত্ব দেয়া হবে। তাই দেয়া হয়েছে। তার তৎপরতায় বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো নকল মুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘ ৫ বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। সেই মিলন ঠিক ঠিকই মন্ত্র্রী হয়েছেন। পড়ুয়া ও বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত তরুণ সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ হয়েছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। দারুণ একটা সমন্বয় হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

এই মন্ত্রিপরিষদের সবচেয়ে বড়ো চমক (নাকি ধাক্কা) হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের অন্তর্ভুক্তি। অথচ আজ মাত্র ৬ মাস আগে এই ড. খলিলুরের পদত্যাগের দাবি তুলেছিল বিএনপি। মিয়ানামারের বিদ্রোহী আরাকান আর্মির জন্য করিডর তৈরিকে কেন্দ্র করে ড. খলিলুরের মুখোমুখি হয় সেনাবাহিনী। এই খলিলুরের অতীত কর্মকাণ্ড ও দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে তখন মিডিয়াগুলো সরব হয়ে উঠে। কিন্তু পরবর্তীতে ১৩ই জুন ২০২৫ ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের লন্ডন বৈঠকে এই খলিলকে দেখা যায় মুখ্য ভূমিকায়। পরবর্তীতে খলিলুরের ব্যাপারে নমনীয় হয়ে উঠে বিএনপি।

নভেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে (সিএসসি) ইউনূসের বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীর যাওয়ার কথা থাকলেও দিল্লির অনুরোধে খলিলুরকে পাঠানো হয়। তখনই বোঝা যায় দিল্লির বিশেষ কৃপাদৃষ্টি আছে খলিলুরের প্রতি। পরবর্তীতে দোহা-ওয়াশিংটন ছোটছুটিতে ব্যস্ত ছিলেন খলিলুর। বোঝা যাচ্ছে, দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের প্রিয়ভাজন খলিলুরকে তারেক তার ক্যাবিনেটে রেখে দুটো পরাশক্তিকে নিজের ফেভারে রাখতে চান।

উদ্দেশ্য যাই হোক। বিষয়টি খুব দৃষ্টিকটূ হয়েছে। ইতোমধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা উঠছে, খলিলুর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগদানের মধ্য দিয়ে এটা জাতির সামনে উন্মোচিত হলো।

গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের দাপটে বিএনপি ছিল কোণঠাসা। রাজপথে কর্মসূচি দিলে হাতে গোণা নেতাকর্মী এক হতেন। তখন রাজপথে যে কজন নেতা সক্রিয় ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: রুহুল কবির রিজভী, মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, নিতাই রায় চৌধুরী, নিপুণ রায় ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় । টকশো মাতাতেন রুমিন ফারহানা। অথচ মন্ত্রিত্বের তালিকায় নেই পুত্রবধূ নিপুণ অথবা শ্বশুর গয়েশ্বর। এ দুঃখে গয়েশ্বর বাবু মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন। নিপুণের চেয়ে অনেকে লো প্রোফাইলের কর্মী এমপি ইলেকশনের টিকেট পেলেও তিনি পাননি। অনেকের ধারণা হিন্দু বলেই এই বঞ্চনা।

অনেকের ধারণা ছিল বিএনপির সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী লুৎফুজ্জামান বাবর এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন। কিন্তু ভারতের চাপে এ বেলায় তিনি কেবিনেটে স্থান পাননি। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ হয়েছেন ধর্মমন্ত্রী। এছাড়া তার রয়েছে আরও অনেক সমস্যা। তিনি মাত্র মাধ্যমিক পাশ, দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে ও ১৯০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি। তিনি তারেক রহমানের আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন সদস্য বলে এই পুরস্কার পেয়েছেন বলে অনেকের ধারণা।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু। টুকুর আপন দুই ভাই মওলানা তাজউদ্দিন ও আবদুস সালাম পিন্টু ছিলেন একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড। পুরো পরিবার প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে লোকপ্রচার আছে। ইনিই তারেক রহমানের গোপন কর্মকাণ্ডের অংশীদার বলে অনেকে ধারণা করে।

তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার পেয়েছেন শেখ রবিউল আলম। এই তো সেদিন, ২০২৪ সালের ১৫ই অক্টোবর, একটি হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। চাঁদাবাজ হিসেবে ঢাকা শহরে তার কুখ্যাতি আছে। এমন লোককে ঢাকা-১০-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনে বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। তখনই সবাই অবাক হয়েছিল। সবাই ধরে নিয়েছিল, এ আসনে মনোনয়ন পাবেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল মান্নানের মেয়ের জামাই ব্যারিস্টার অসীম। গত ১৭ বছর অসীম আদলত ও মিডিয়ায় তৎপর ছিলেন বিএনপির পক্ষে। অথচ দেখা গেল খুনের আসামী হয়ে গেছেন সংসদ সদস্য। এখানেই শেষ নয়, সেই বিতর্কিত ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়া হয়েছে পুরো দেশের পরিবহন ব্যবস্থা। তিনি সড়ক ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এতো বিশাল কর্মপরিধি আর কোনো মন্ত্রীর হয়নি।

হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সাহসী মুখ গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) এর সভাপতি নুরুল হক নুর মন্ত্রিপরিষদে স্থান পেয়েছেন। ঠাঁই পেয়েছে রাজপথের দীর্ঘদিনের লড়াকু সৈনিক মাহবুব আনাম স্বপন। নির্বাচনে হেরেও মন্ত্রী হয়েছেন সাফ জয়ী সাবেক ফুটবলার আমিনুল হক।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার জন্য বুলডোজার পাঠিয়ে সমালোচিত ইশরাক হোসেনকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। সবাই ভেবেছিল মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বানানো হবে। কিন্তু ইশরাকের মতো মাথাগরম একজন এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ায় অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

ফজলুর রহমান পটল, তরিকুল ইসলাম, ওবায়েদুর রহমান, হারুনার রশীদ খান মুন্নু, সাদেক হোসেন খোকদের অবদান স্মরণ করে তাদের সন্তানদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সবচেয়ে বড়ো দাবিদার ছিলেন নিপুণ রায় ও রুমিন ফারহানা। রুমিন মনোনয়ন না পেয়ে মনের দুঃখে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছেন।

বরাবরের মতো এক ঝাঁক স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্তরাধিকারকে মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই দিয়েছে বিএনপি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন চোখা মিয়া ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা এবং কুখ্যাত রাজাকার। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়া আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পিতা কুখ্যাত রাজাকার মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ওরফে নবী চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পিতা খান বাহাদুর আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা ও কুখ্যাত রাজাকার।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী এবং টাংগাইল -১ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের পিতা আফাজ উদ্দিন ফকির মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খাঁন চৌধুরীর পিতামহ বা দাদা আশরাফ হোসেন খান চৌধুরী ছিলেন কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ও স্বাধীনতাবিরোধী। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী হওয়া ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইনের পিতা ইসমাইল হোসেন তালুকদার ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা ও স্বাধীনতাবিরোধী। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের পিতা ফরিদপুরের কুখ্যাত রাজাকার নুলা মুসা।

বেশ কিছু বছর ধরে টক শোতে সরকার বিরোধী কথা বলে দর্শকদের চোখে পড়েছিলেন ডা. জাহেদ উর রহমান। বয়সে তরুণ এই ব্যক্তির মাঠে ময়দানে কোন কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি। রাজনীতি করলেও নির্বাচনে যাননি কখনো। তিনি সৃজনশীল দালালির পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টার পদ। তার রাজনৈতিক গুরু নাগরিক ঐক্যের সভাপতি, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা মাহমুদুর রহমান মান্না নির্বাচনে জামানত খুইয়েছেন। তার দলের সব প্রার্থীরই একই অবস্থা। অথচ মান্নার বদলে মন্ত্রিত্বের মেডেল পেলেন এসি রুমের নিরাপদ খেলোয়াড় ডা. জাহেদ। জাহেদের এই পুরস্কার বিএনপিতে বুদ্ধিবৃত্তিক দালালিকে উৎসাহিত করবে।

এই বিচিত্র ধরনের লোকজন নিয়ে আগামী ৫ বছর দেশটা কেমন চালান তারেক রহমান, তাই দেখার অপেক্ষা।

Visited 19 times, 1 visit(s) today