❐ স্থানীয় সংবাদদাতা
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় শখের বশে সাত বস্তা পরিযায়ী পাখি শিকার করে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাসহ ছয়জন প্রশাসনের দণ্ডের মুখে পড়েছেন।
বন্যপ্রাণি নিধনের মত ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের পরেও নিজেদের অপকর্মে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা দেখা যায়নি তাদের মাঝে। বরং শত শত পাখি মারার পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করেছেন এসব পাখি হত্যায় কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না, স্রেফ শখের বশেই পাখি মেরেছেন, যা আগেও করেছেন তারা।
গত ২৬শে মার্চ, বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার মাথাভাঙ্গা এলাকায় স্থানীয়রা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের উদ্ধার করেন। পরে অপরাধ স্বীকার করায় ও বয়স বিবেচনায় তাদের অর্থদণ্ড প্রদান করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আ. স. ম. হাদিউল ইসলাম ভূঁইয়া (৮১), আবরার উদ্দিন আহমেদ (৭০), হাজী ওসমান আলী (৭৭), মাজহারুল হক কোরেশী (৭০), আব্দুল্লাহ নূর (৭২) ও আরিক আহমেদ (২৭)।
এদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে ১ লাখ টাকা এবং বাকি পাঁচজনকে ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে পাখি শিকারের কাজে ব্যবহৃত ৩টি শটগান, ১টি এয়ারগান ও ৬৩ রাউন্ড শটগানের গুলি জব্দ করা হয়।
তবে বয়স বিবেচনা এবং আর্থিক দণ্ডপ্রদানকে স্থানীয়রা ‘লোক দেখানো’ আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ঢাকা থেকে ওই ছয়জন গজারিয়ায় আসেন। এসময় সঙ্গে ছিল অত্যাধুনিক বন্দুক ও গুলি। তারা ট্রলারে করে মেঘনা নদীর বিভিন্ন চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এলাকায় সারাদিন পাখি শিকার করেন। সন্ধ্যায় তারা যখন ফিরে আসছিলেন, তখন স্থানীয়রা দেখতে পান তাদের কাছে থাকা সাতটি বস্তাভর্তি শত শত পাখি।
এই খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা মাথাভাঙ্গা ঈদগাহ এলাকায় অবরুদ্ধ করে রাখেন তাদের। পরে খবর পেয়ে রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পুলিশ সদস্যরা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সে সময় ওই ছয়জন তাদের অপরাধ স্বীকার করেন। তাদের বয়স বিবেচনা করে কারাদণ্ড না দিয়ে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পাখি শিকারে ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি জব্দ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী মো. জয়নাল বলেন, তারা যেভাবে পাখি শিকার করতে এসেছেন সেটা কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে কম নয়। বিভিন্ন ধরনের বন্দুক ও কৌটাভর্তি গুলি ছিল তাদের কাছে। এক দিনেই তারা কয়েক হাজার পরিযায়ী পাখি শিকার করেছেন। ওজনে সাতটি বস্তায় অন্তত চার মণের বেশি পাখি হবে বলে আমাদের ধারণা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু সুফিয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা শত শত পাখি হত্যা করেছেন। এক দিনেই যদি এভাবে এত পাখি মেরে ফেলা হয়, তবে প্রকৃতি থেকে অচিরেই এসব পাখি হারিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাদিউল ইসলাম ভূঁইয়া স্বীকারোক্তি দিয়ে জানান, তার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না; স্রেফ শখের বশেই তিনি পাখিগুলো শিকার করেছেন।
এর আগেও একাধিকবার পাখি শিকার করতে গজারিয়ায় এসেছিলেন বলে জানান তিনি।
গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাসান আলী বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত থেকে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে এবং অভিযুক্তদের বক্তব্যে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, অভিযুক্তরা বয়স্ক হওয়ায় তাদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে কারাদণ্ড না দিয়ে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হন, সেজন্য তাদের সতর্ক করা হয়েছে। সেইসঙ্গে শিকারের কাজে ব্যবহৃত বন্দুক ও গুলি জব্দ করা হয়েছে।

