বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনা একজন দূরদর্শী ও সাহসী নেত্রী হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটে তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ দেশকে বারবার বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। তিনি কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ফসল রক্ষায় দ্রুত সাড়া—এসব ক্ষেত্রে অসাধারণ সংকট ব্যবস্থাপনার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে একটি ‘রেজিলিয়েন্ট’ (স্থিতিস্থাপক) জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কোভিড-১৯ সংকট ব্যবস্থাপনা: সকলের জন্য বিনামূল্যে টিকা
২০২০ সালে বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারিতে বিপর্যস্ত, তখন শেখ হাসিনা তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য কোভিড-১৯ টিকা বিনামূল্যে প্রদান করা হবে।
তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে (জাতিসংঘসহ) বারবার দাবি করেন যে টিকা যেন দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়। সরকার টিকা ক্রয়ের পেছনে খরচ করতে পিছপা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “টিকা যেকোনো মূল্যে সংগ্রহ করা হবে।” ফলে বাংলাদেশ দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে এবং দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীকে (৭০ শতাংশেরও বেশি) পূর্ণাঙ্গভাবে টিকাদান করতে সক্ষম হয়।
তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্ত, তহবিল বরাদ্দ এবং জনসচেতনতা কর্মসূচির ফলে মৃত্যুর হার অনেক কম ছিল এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হয়। এটি তাঁর সংকট ব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি খাত ব্যবস্থাপনা
২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির (বিশেষ করে গ্যাস ও তেলের) দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনা সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামালের বৈচিত্র্যকরণ করে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বায়ু বিদ্যুৎ, সৌর বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক, কয়লাভিত্তিক, ডিজেলভিত্তিক… ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পৃথক পৃথক জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন শেখ হাসিনা। যার ফলে একক কোনো কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সুযোগ ছিল না।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া হয়। সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য নানা নীতি প্রয়োগ করে এবং জনগণকে সচেতন করে। ফলে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখা যায়। এই সংকটেও তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা: ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও দ্রুত সাড়া
বাংলাদেশ নিম্নভূমি হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। হাজার হাজার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (CPP)-এর অধীনে লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবক (বিশেষ করে নারী) প্রশিক্ষিত হয়।
আগাম সতর্কবার্তা, দ্রুত সাড়া এবং সমন্বিত উদ্ধার অভিযানের ফলে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, মোরা, ফণীসহ বড় দুর্যোগে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা পায়। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “প্রাণ রক্ষাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।” তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বমডেলে পরিণত করেছে।
সাইক্লোন ও বন্যায় তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রাণহানির সংখ্যা হ্রাস
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশ্বের কাছে একটি মডেল হয়ে উঠেছে। আগের দশকগুলোতে (১৯৭০-১৯৯০ এর দশকে) একটি বড় ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটত। কিন্তু তাঁর আমলে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও মুজিব কিল্লা নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়। সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (CPP)-এর অধীনে লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবক (বিশেষ করে নারী) প্রশিক্ষিত হয়।
আগাম আবহাওয়া সতর্কবার্তা, দ্রুত সাড়া, সমন্বিত উদ্ধার অভিযান এবং জনসচেতনতা কর্মসূচির ফলে প্রাণহানি নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্ফান-এ মাত্র ২৬ জনের মৃত্যু হয়, যেখানে আগের তুলনায় একই শক্তির ঝড়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। একইভাবে সিডর (২০০৭), আইলা, মহাসেন, ফণী, বুলবুল, ইয়াসসহ বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কয়েকশ থেকে কয়েক ডজনে নেমে আসে।
বন্যার ক্ষেত্রেও হাওর অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ত্রাণ বিতরণ, বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার এবং ফসল রক্ষায় আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা পায় এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনও দ্রুত সম্পন্ন হয়।
তাঁর এই মানবিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।এসব উদ্যোগে তাঁর দূরদর্শিতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনকল্যাণমূলক মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের প্রারম্ভিক বন্যায় ফসল রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে প্রায়ই প্রারম্ভিক বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। শেখ হাসিনা সরকার এখানে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, দ্রুত ফসল কাটার সহায়তা, বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের পাশে দাঁড়ায়।
প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ত্রাণ, বীজ ও সার বিতরণ নিশ্চিত করেন। খাদ্যশস্যের ক্ষতি পূরণে ভিজিএফ, ভিজিডি এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়। ফলে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা বজায় থাকে এবং কৃষকরা পুনর্বাসিত হয়। তাঁর এই দ্রুত ও সমন্বিত সাড়া হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় নিশ্চয়তায় শেখ হাসিনার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের অগ্রযাত্রা
- রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট (২০১৭): মিয়ানমারের সামরিক নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা ১১ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে আশ্রয় দেন। কক্সবাজারে বিশাল শরণার্থী শিবির গড়ে তোলা হয় এবং জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় জনগণের সহায়তায় খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকটের একটি মানবিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে প্রশংসিত হয়।
- রানা প্লাজা ধস (২০১৩): সাভারে গার্মেন্টস ভবন ধসে ১১৩০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন, আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর সাথে সমন্বয় করে গার্মেন্টস কারখানার নিরাপত্তা উন্নয়নে ‘অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি’ চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।
- অর্থনৈতিক সংকট ও অন্যান্য: বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট এবং মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে দ্রুত প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, কৃষি ও শিল্প খাতে সহায়তা প্রদান করেন।
শেখ হাসিনা শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, তিনি একজন সংকট ব্যবস্থাপক। কোভিডে বিনামূল্যে টিকা, জ্বালানি সংকটে স্থিতিশীলতা, দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ প্রাণ রক্ষা এবং বন্যায় ফসল ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শিতা, মানবিকতা ও দ্রুততা দেশকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে।
তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে যে, সঠিক নেতৃত্বে সংকটকে সুযোগে রূপান্তরিত করা সম্ভব। তাঁর এই অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
