গোলাম হোসেন
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে, এমন আলোচনা করা ঠিক হবে না। ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম-এ কালবেলা সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম ছিলো “মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে, এমন আলোচনা করা ঠিক হবে না: প্রধানমন্ত্রী”।
কালবেলায় প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ শহিদ জিয়ার লেখা ‘একটি জাতির মুক্তি’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। সেসময় মুক্তিযুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে। তখন একজন মুক্তিযোদ্ধাও এ বইয়ের কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধিতা করেন নাই। এতেই প্রমাণ হয় শহীদ জিয়া দেশের মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য চরিত্র।”
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও তার প্রেক্ষাপট নিয়ে “একটি জাতির জন্ম” শীর্ষক শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, নিবন্ধটি ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, এরপরেও বিভিন্ন সময়ে একাধিক দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। জনাব তারেক রহমান তাঁর পিতার লেখা নিবন্ধটির কথা স্মরণ করতঃ উল্লিখিত বক্তব্যে পিতৃসত্য পালনের একটি ইঙ্গিত প্রতীয়মান হলো।
জনাব তারেক রহমান তাঁর পিতার মৃত্যুর সময়ে পরিণত বয়সে পদার্পণ করেননি বিধায় জীবন চলারপথে করণীয় ও পালনীয় বিষয়ে তাঁর পিতা তাঁকে বিশেষ কোন আদেশ-নির্দেশ বা উপদেশ প্রকাশ্যে দিয়ে যেতে পারেননি, তাছাড়া তাঁর বিয়োগান্তক ঘটনাটি অসময়ে ঘটেছে, যা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। অতএব ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধে তিনি যাহা লিখেছিলেন, তাহাই জনাব তারেক রহমানের জন্য পিতৃসত্য।
জনাব তারেক রহমানের উল্লিখিত বক্তব্যের বিশ্লেষণে বিএনপির সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ২৮ মার্চ ইউটিউবের একটি টকশোতে বলেছেন, সত্যের সূর্য উদয় হতে উঁকি দিয়েছে মাত্র, এখনো উদিত হয়নি, তবে তারেক রহমানের এমন বক্তব্যে সত্যের সূর্য উদিত হবে মর্মে তিনি আশাবাদী। আমিও আশাবাদী। তাই, এই আলোচনা করছি।
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের আশা পূর্ণতা পাবে কি-না? না-কি নিরাশায় পর্যবসিত হবে?
দেখুন, এখন পর্যন্ত তা দৃশ্যমান নয়। এখনো ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করেননি। ২৬ মার্চ একাবারও বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে আনেননি, স্বাধীনতার মহানায়ককে সম্মান দেখাননি। অতএব, জনাব তারেক রহমানের এই বক্তব্যের আলোকে তিনি কার্য সম্পাদন করবেন এমনটি এখনো বুঝা যাচ্ছে না, তাই ফজলুর রহমান বলেছেন, সত্যের সূর্য উঁকি দিয়েছে মাত্র।
প্রসঙ্গত যেই কথা বলতে চাই, তা হলোঃ জনাব জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান নিয়ে কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করেননি। বঙ্গবন্ধু তাঁকে খুব পছন্দ করতেন এবং স্নেহ করতেন। তিনি যেদিন “একটি জাতির জন্ম” নিবন্ধ লিখেছিলেন, সেদিন তিনি চাকুরিরত, সেনাবাহিনীতে চাকুরিরত অবস্থায় পত্র পত্রিকায় কোন রাজনৈতিক নিবন্ধ বা প্রবন্ধ লেখা যায় না, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা থাকা এবং বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য হওয়ার কারণেই লিখতে পেরেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু তাঁকে খাটো করেননি। আওয়ামী লীগের এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকাকে খাটো করে দেখা বা তাঁকে পাকিস্তানের চর বলার কথাটি জনাব জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর এসেছে।
তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে যখন স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রশ্রয় দিয়েছেন, স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন, গোলাম আজমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন, স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকুরী দিয়েছেন, তখনই মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তবে এই প্রসঙ্গের মীমাংসা অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে জনাব জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে অনস্বীকার্য করার সুযোগ বিএনপির এসেছিল, আবারও বর্তমানে এসেছে। ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একই মোহনায় এসে দেশ থেকে স্বৈরাচার উৎখাত করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন।
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসীন হয়ে জনাব জিয়াউর রহমানের ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারতেন, ইতিহাসের সত্যটা তুলে ধরার প্রয়াসে জনাব জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন, তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতার দোহাই দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারতেন। কিন্তু, তিনি তা করলেন না। এমনকি তিনি তাঁর স্বামীর হত্যার বিচার পর্যন্ত চাইলেন না বা এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার করলেন না।
তাতে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসনের প্রেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যেসব প্রশ্নের জন্ম নিয়েছিল, সেগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেলো।
তারপর ঘটনা আরো জটিল হলো, ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জামায়াতকে নিয়ে সরকার গঠন করলেন, স্বাধীনতা বিরোধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই দিলেন, তাতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বিএনপির অবস্থানই প্রশ্নবিদ্ধ হলো।
১৯৯১ সালে যেই সুযোগটি বেগম খালেদা জিয়ার বা বিএনপির সরকার হাতছাড়া করেছিলো, সেই সুযোগটি ২০২৬ সালে জনাব তারেক রহমান বা বিএনপির সরকারের হাতে এসেছে। এখন দেখার বিষয় জনাব তারেক রহমান সেই সুযোগটি হাতছাড়া করবেন কি-না।
“একটি জাতির জন্ম” তারেক রহমানের সামনে পিতার একটি দিকনির্দেশনার দলিল, যাকে আমি পিতৃসত্য বলছি। জনাব তারেক রহমান ইচ্ছে করলে, ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটি সংবিধানের তফসিলে ঠাঁই দিতে পারেন, কারণ তাঁর দল বিএনপি সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন। ইউনূসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে জাতীয় শোক দিবস পালন থেকে বিরত থেকে ইতিহাসের সত্যের পথে হাঁটা সম্ভব নয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান, দুজনই রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় খুনের শিকার হয়েছিলেন, দুটি দিনই রাষ্ট্রীয় শোক হিসেবে পালন করাই হবে মনুষ্যত্বের পরিচয়। মার্চ ১৮, ২০২৬ অনলাইন প্রকাশনা ‘বিডিডাইজেস্ট’-এ আমার একটি বিশ্লেষণ “ইউনূসসহ তার উপদেষ্টারা ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা বঙ্গবন্ধু হত্যা-মামলার আসামি হবেন যে কারণে” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ পালন রোধ করার বিষয়ে একটি আইনী বিশ্লেষণ তুলে ধরেছি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টিতে নিশ্চয়ই পড়েছে। অতএব, ইতিহাসের সত্যের পথে জনাব তারেক রহমান দৃঢ় হবেন, সত্যের সূর্য উদিত হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় এগিয়ে যাবেন এমনটাই জাতির প্রত্যাশা। যেই জাতির জন্মের কথা তাঁর পিতা ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বলেছিলেন।
গোলাম হোসেন,
আইনজীবী।
মার্চ ২৯, ২০২৬।

