অর্থনীতির শিক্ষক ইউনূসের ‘শোষণামলে’ তিন মাসেই ৩ হাজার শিক্ষক মবের শিকার

অর্থনীতির শিক্ষক ইউনূসের ‘শোষণামলে’ তিন মাসেই ৩ হাজার শিক্ষক মবের শিকার
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


ড. ইউনূস; ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ তিনি নিজে অর্থনীতির শিক্ষক; অনেকেই আশা করেছিলেন তার শাসনামলে দেশ শিক্ষাদীক্ষায়, সৌহার্দে-সম্প্রীতিতে, সুশাসনের পথে এগিয়ে যাবে। অথচ তার আমলটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ইতিমধ্যে তার শাসনামলকে শ্লেষের সাথে অনেকেই ‘শোষণামল’ এবং কেউ কেউ ‘আইয়ামে ইউনূসীয়া’ বলে চিত্রায়িত করছেন সামাজিক মাধ্যমে।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তার ভয়াবহ শিকার হন জাতিগঠনের কারিগর মহান শিক্ষকরা। ইউনূসের অন্তর্র্বতী সরকারের সময়জুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মব-সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন শিক্ষকরা। শারিরিক ও সামাজিকভাবে হেনস্থার সঙ্গে আর্থিক ও মানসিক পীড়নও সইতে হয় তাদের।

কেবল মতের অমিল, পদের দ্বন্দ্ব ও প্রতিষ্ঠান দখলের কারণে এসব ঘটনা ঘটলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। উল্টো নির্যাতিত শিক্ষককে আরো হয়রানি করেছে এমন ঘটনাও ঘটেছে। ইউনূসের সময়ের পুরোটা শিক্ষকরা আতঙ্কে ছিলেন।

বরিশালের গৌরনদীর মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীর ওপর হামলার ঘটনাটি এই সময়ের নির্মমতার প্রতীক।

১৮ই আগস্ট শতাধিক ব্যক্তি তাঁর বাসায় হামলা চালিয়ে তাঁকে পরিবারসহ অবরুদ্ধ করে রাখে। জীবন বাঁচাতে আকুতি জানানো সেই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেনাবাহিনী এসে তাঁদের উদ্ধার করে। কিন্তু এরপরও থামেনি নিপীড়ন জোরপূর্বক পদত্যাগ, চাকরিচ্যুতি এবং দীর্ঘদিনের নির্বাসিত জীবন তাঁর নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়।

এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশজুড়ে অন্তত ৩ হাজার শিক্ষক এই মব-সহিংসতার শিকার হয়েছেন; কিছু সংগঠনের হিসাবে এই সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি। তবে এই মব সন্ত্রাসে তখন নেতৃত্ব দেয় বিএনপি, জামায়ত-শিবির ও তাদের লেজুড় সংগঠন এনসিপিসহ সমমনা সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসীরা।

অভিযোগের ধরণ প্রায় একই। আওয়ামী লীগের সমর্থক আখ্যা, আর নইলে দুর্নীতির অপবাদ। ব্যক্তিস্বার্থে শিক্ষার্থীদের উস্কে দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা হয়। দলবদ্ধ হামলা, অপমান, মারধর এবং জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর আদায়ের কমন প্যাটার্ন ছিল ঘটনাগুলোতে।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে প্রধান শিক্ষক ইউনুস নবীকে প্রকাশ্যে মারধর ও অপদস্থ করা হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে একাধিক শিক্ষক এখনো কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে মব সৃষ্টি করে অধ্যক্ষ ও এক শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া হয়, যার পেছনে ছিল প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা।

ধামরাইয়ের এক পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকেও একইভাবে অপসারণ করা হয়। কোথাও জামা-কাপড় ছিঁড়ে গণপিটুনি, কোথাও নারী শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা, কোথাও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে রাতের আঁধারে বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে।

নিজের শিক্ষার্থীদের সামনে, কখনো তাদের দ্বারা অপমান-লাঞ্ছনার শিকার হয়ে অনেক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েন, মারা যান বেশ কয়েকজন শিক্ষক। শারীরিক আঘাতের চেয়ে একজন শিক্ষকের কাছে মানসিক আঘাত এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার যাতনটাই ছিল প্রবল।

সবচেয়ে উদ্বেগজন বিষয় হলো এই ঘটনাগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ ছিল অনুপস্থিত।

অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নির্যাতিত শিক্ষকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও শিক্ষকরা কাজে ফিরতে পারেননি। কারও বেতন বন্ধ, কারও যোগদানে বাধা প্রশাসনিক উদাসীনতা যেন মবকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছে।

তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তা ছিল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে মব-সহিংসতা থামাতে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আইনশৃঙ্খলার পরিবর্তে দখল সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার অভিযোগ জোরালো হয়েছে। প্রশাসনের কোন সহযোগিতা পাননি শিক্ষকরা।

সুধীজনের মতে এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে রাষ্ট্র যখন নিষ্ক্রিয় থাকে, তখন সংগঠিত সহিংসতা সহজেই বৈধতা পায়। আর সেই শূন্যতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের নীরব নির্মাতা শিক্ষকরা। এ কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক ড. ইউনূস এবং তার সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নির্যাতিত শিক্ষক ও তার পরিবারের লোকজন।

Visited 14 times, 1 visit(s) today