বিডি ডাইজেস্ট প্রতিবেদন
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫০ শয্যার আইসিইউ (ICU) ইউনিটের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল এবং আইনি নৈতিকতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। যা বাংলাদেশের প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো এবং ‘ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স’-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের সংবিধান বা প্রচলিত আইন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর স্বামী বা স্ত্রী কোনো সাংবিধানিক বা সরকারি পদ ধারণ করেন না। তারা কেবল প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হতে পারেন কিংবা ব্যক্তিগত পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন। কিন্তু ডা. জুবাইদা রহমান কোনো সরকারি দায়িত্বে না থাকা সত্ত্বেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের প্রধান অতিথি হিসেবে ফিতা কেটেছেন এবং তার নাম উদ্বোধনী ফলকে স্থান পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুইজন পূর্ণ মন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রী (যিনি আবার প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার)। পদমর্যাদার ক্রমানুসারে (Warrant of Precedence) মন্ত্রীরা রাষ্ট্রের চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। অথচ সেই তালিকায় যাদের নামই নেই, এমন একজন ‘ইন্ডিভিজুয়াল’ ব্যক্তিত্বের অধীনে মন্ত্রীদের ‘সম্মানিত অতিথি’ হিসেবে বসে থাকাটা প্রশাসনিক মহলে চরম অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই নিয়ে কানাঘুষা চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা বুঝে উঠতে পারছি না কীভাবে প্রটোকল সাজাবো। এটি কেবল বেঠিক নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রশ্নবিদ্ধ উদাহরণ হয়ে থাকল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বেগম জিয়ার সাথে ২০০১ সালের পর তারেক রহমানের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে উপস্থিতিও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তবে মজার বিষয় হলো, সেই সময়কার তীব্র সমালোচনার মুখেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারেক রহমানের নাম সরাসরি উদ্বোধনী ফলকে থাকতো না। কিন্তু এবার ডা. জুবাইদার ক্ষেত্রে সরাসরি সরকারি ফলকে নাম যুক্ত হওয়াটা এক নতুন ‘পরিবারতন্ত্রের’ ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।
আমেরিকার সংবিধানে ‘অফিস অফ দ্য ফার্স্ট লেডি’র একটি স্বীকৃত কাঠামো রয়েছে। যারা হোয়াইট হাউজের হোস্টেস হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশে এমন কোনো রাষ্ট্রীয় পদ নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের এসএসএফ (SSF) নিরাপত্তা পাওয়া এবং সরকারি খরচে সফরসঙ্গী হওয়ার আইনি অধিকার থাকলেও, সরকারি প্রকল্প উদ্বোধনের কোনো এক্তিয়ার নেই।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনি ইশতেহারে সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবারের সদস্যদের এভাবে সম্পৃক্ত করা সেই প্রতিশ্রুতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্র কি এখন ব্যক্তি বা পরিবারের ইচ্ছায় চলবে, নাকি সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে?
সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘অনৈতিক’ এবং ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, সরকারি অর্থায়নে নির্মিত প্রকল্প উদ্বোধনের অধিকার কেবল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের।
