আলি শরিয়তি
লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
এই ভদ্রলোককে নিশ্চয়ই আপনারা চিনেন। এতোদিনে চেনার কথা। তিনি অধ্যাপক ড. মোঃ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তাঁর প্রধান পরিচয় হলো- তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান।
ইউনূস শাসনামলে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এরপরে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা হন। এখন মন্ত্রী মর্যাদায় এই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
এবার তাঁর আরও কিছু পরিচয় তুলে ধরা যাক।
তিনি ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তাঁর রেজাল্ট কি জানেন? তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরা বলেন একে-৪৭, অর্থাৎ অনার্সে সেকেন্ড ক্লাস এবং মেধাতালিকায় ৪৭তম হয়েছিলেন। তবে আরেকটি কথাও জেনেছি যে, তিনি সেকেন্ড ক্লাস ৪৭তম নয়, বরং সামষ্টিকভাবে ৪৭তম হয়েছিলেন এবং তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এর পরে আর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেননি। অনার্সের পরেই একটি এনজিও-তে চাকরি নেন।
এনজিও থেকে সোজা লন্ডনে। লন্ডনের একটি অখ্যাত কলেজ থেকে ‘ডেভেলপমেন্ট এন্ড ফিনান্সিয়াল ইকোনমিক্স’ বিষয়ে মাস্টার্স করেন ১৯৯৭ সালে। এবার তিনি জাতে উঠে গেলেন। বিদেশী ডিগ্রি অর্জন করেছেন, চাট্টিখানি কথা!
দেশে ফিরে এসে আবারও এনজিও। ইতিমধ্যে বিদেশী অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়, যেখানে শুধু মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়া হতো। সম্প্রতি অনার্স কোর্সও চালু করেছে। মজার ব্যাপার হলো এই বিদেশী অর্থায়ন ছিল একটি এনজিও-এর মাধ্যমে এবং তিতুমীরের পরম সৌভাগ্য যে তিনি সেই এনজিও-তেই কাজ করতেন। বিষয়টা এমন হয়েছিল যে, তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল, নইলে ফান্ড পাওয়া যাবে না। এই ফলশ্রুতিতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বনে যান। এটুকু হলো তিতুমীরের শিক্ষক হবার ঘটনা।
এরপরে তিনি আবারও লন্ডনের একটি অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি কোর্সে এডমিশন নেন। এবার কিন্তু পিএইচডি করলেন অর্থনীতি বিষয়ে, ডেভেলপমেন্ট বাদ। পিএইচডি কার অধীনে জানেন? ব্রিটিশ-বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ড. মোশতাক খানের অধীনে। মোশতাক খান পরে সোয়াসের অধ্যাপক হয়েছিলেন, কিন্তু তিতুমীরের পিএইচডিকালে অখ্যাত এক কলেজে ছিলেন। ইদানিং তাঁকে বিভিন্ন পত্রিকায় নানারকম অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে কলাম লিখতে দেখা যায়। ২০০৪ সালে তিতুমীর পিএইচডি লাভ করেন। এরপরে অধ্যাপক পদে প্রমোশন পান এবং বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
তিতুমীরের সহকর্মী অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ তার আত্মজীবনী ‘আমার জীবন আমার সংগ্রাম’ বইতে লিখেছেন, তিতুমীর পিএইচডি থিসিস কিভাবে লিখবেন সেজন্য ‘মাহবুব উল্লাহর বাসায় গিয়ে মাহবুব উল্লাহর পিএইচডি থিসিস ধার নিয়েছিলেন।’ নিশ্চয়ই হুবহু কপি করেননি, তবে কি ধরনের সহযোগিতা নিয়েছেন তা বলা মুশকিল। এই হলো রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের উচ্চশিক্ষার গল্প।
এবার তার ছাত্রজীবনের রাজনীতি নিয়ে কয়েকটি কথা। তিতুমীর ছাত্রজীবনে ছাত্র ফেডারেশনের নেতা ছিলেন। অনেকেই চিনবেন সাব্বির বিন শামস সুমন, আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরআই-এর প্রধান নির্বাহী ছিলেন, ইটিভি এবং বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক, সর্বশেষ লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে মিনিস্টার পদেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ছিলেন; এই সাব্বির বিন শামস সুমন ও তিতুমীর হলেন হরিহর আত্মার বন্ধু, মানিকজোড় এবং ছাত্র ফেডারেশনের নেতা। সাব্বির বিন শামস সুমন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি। এদের পরের সারির নেতা ছিলেন জোনায়েদ সাকি। তখনও ছাত্র ফেডারেশন বদরুদ্দীন উমরের অনুগত সংগঠন ছিল। জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বে পরবর্তীতে বদরুদ্দীন উমরের বলয়ের বাইরে বেরিয়ে আসে।
যা বলছিলাম, ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্র আলোচিত রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর শিক্ষকতার যোগ্যতা না থাকলেও শিক্ষক হয়েছিলেন। একদা বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় তিতুমীর এখন ডিপ স্টেট এর খাঁটি প্রতিনিধি। তিতুমীর, খলিল এবং আরও অনেকের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, বর্তমান সরকার হলো মূলত ইউনূস সরকারের এক্সটেনশন এবং ডিপ স্টেটের আশীর্বাদপুষ্ট সরকার। এবং এটাও প্রমাণ হয় যে, ইউনূস সরকার পরিকল্পিতভাবেই বিএনপিকে নির্বাচনে বিজয়ী করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন।
মহানীতিবান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কথা ও কাজগুলো কেন অসামঞ্জস্যপূর্ণ তা তার অতীত জীবন থেকেই স্পষ্ট।
