অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম
বাংলাদেশি আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিবারই যখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে, তখন প্রথম আঘাত নেমে এসেছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। বিচারব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন—সবকিছুকে ধীরে ধীরে পরিণত করা হয়েছে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষাগারে। আজ দেশের বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে ঘিরে যা ঘটছে, তা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোনো বিপজ্জনক ধারারই নতুন সংস্করণ।
গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর থেকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, গাজীপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, দিনাজপুর, নওগাঁ, ঝালকাঠি, পঞ্চগড়, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, জামালপুর ও ঠাকুরগাঁওসহ দেশের অন্তত ১৯টি বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত বা স্বতন্ত্র তিন শতাধিক আইনজীবীকে নির্বাচন করতে দেওয়া হয়নি।
কোথাও বার নির্বাচনে দায়িত্বরত নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র প্রদান করেনি, কোথাও মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বর্তমান সরকার ও বিরোধীদলীয় আইনজীবীরা বাধা প্রদান করেছে অথবা জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার নির্বাচন কমিশন সরাসরি প্রার্থিতা বাতিল করেছে। কোথাও এমন ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহসই পাননি।
“ফ্যাসিস্টের সহযোগী” আখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনে ৪২ জন আইনজীবীর মনোনয়ন এবং ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির ১৬ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া মুন্সীগঞ্জ বার অ্যাসোসিয়েশনে ১১ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের ২৩টি পদের, চট্টগ্রাম বার অ্যাসোসিয়েশনের ২১টি পদের কোনো পদেই এবং শরীয়তপুর, বরিশাল ও জামালপুর বার অ্যাসোসিয়েশনের ১৫টি পদের কোনোটিতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-সমর্থিত স্বতন্ত্র আইনজীবীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পারেননি।
গাজীপুর বারে ১৬টি পদের বিপরীতে ৩৯ জন আইনজীবী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে গেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁদের মনোনয়নপত্র প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। চট্টগ্রাম বারে ২১টি পদের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে চাইলে বর্তমান সরকার ও বিরোধীদলীয় আইনজীবীরা বাধা প্রদান করে এবং একপর্যায়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁর কার্যালয়ের দরজা বন্ধ করে দেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থীর বাড়িতে ভোটের আগের দিন গভীর রাতে পুলিশ গিয়ে নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের চাপ প্রদানের ঘটনাও ঘটেছে।
তাছাড়া, শরীয়তপুরে এনসিপি-সমর্থিত এক আইনজীবী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। কুমিল্লা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে মনোনয়নপত্র জমা প্রদান করতে পারলেও নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করেছে বর্তমান সরকার ও বিরোধীদলীয় আইনজীবীরা।
তাছাড়া, রাজশাহী, খুলনা, নওগাঁ, ঝালকাঠি, মানিকগঞ্জ, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও চাঁদপুর বারে দীর্ঘদিন যাবৎ গ্রেপ্তার, বিভিন্ন মামলায় জড়ানো ও জড়ানোর হুমকি, মব হামলার আশঙ্কাসহ বিভিন্নভাবে এমন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যে আওয়ামীপন্থী ও সাধারণ আইনজীবীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাহস পাননি।
এই ঘটনাগুলো শুধু একটি দলের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক চেতনার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই অন্যায়কে এখন “নৈতিক অবস্থান” হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যেন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করাই অপরাধ। যেন রাষ্ট্র বা কোনো গোষ্ঠী ঠিক করে দেবে কে নাগরিক হিসেবে পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে আর কে করবে না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনসহ দেশের প্রতিটি বার অ্যাসোসিয়েশনই পেশাজীবী ও অরাজনৈতিক সংগঠন।
প্রশ্ন হচ্ছে: একজন আইনজীবী যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে আদালত কোথায়? বিচার কোথায়? রায় কোথায়? বাংলাদেশের সংবিধান কি বাতিল হয়ে গেছে? নাকি এখন থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ই হবে অপরাধ প্রমাণের একমাত্র মানদণ্ড?
আজ যাদের বলা হচ্ছে “ওরা আওয়ামী লীগপন্থী”, কাল অন্য কাউকে বলা হবে “ওরা বিএনপিপন্থী”, পরশু বলা হবে “ওরা সরকারবিরোধী”। এই যুক্তির শেষ নেই। ইতিহাস সাক্ষী—যে রাষ্ট্র রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া শুরু করে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের গণতান্ত্রিক ভিত্তিই ধ্বংস করে ফেলে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই সংস্কৃতি এখন বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যেসব আইনজীবীর কাজ আইনের শাসন রক্ষা করা, তারাই যদি “আমার মতের না হলে নির্বাচন করতে পারবে না”—এই মানসিকতা ধারণ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিক কোথায় ন্যায়বিচার খুঁজবে?
বার অ্যাসোসিয়েশন কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন নয়। এটি আইনজীবীদের পেশাগত প্রতিষ্ঠান। সেখানে নির্বাচন হওয়ার কথা যোগ্যতা, পেশাগত সততা, নেতৃত্বের দক্ষতা ও সহকর্মীদের আস্থার ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে সেটিকে বানানো হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যুদ্ধক্ষেত্র।
যদি আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছরে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন ভয়ভীতি, হামলা, গ্রেপ্তার ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগে কলঙ্কিত হয়ে থাকে এবং বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন, তবে তা বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলের ভয়ভীতি, হামলা, গ্রেপ্তার ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগের কাছে নস্যি। তাছাড়া, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত অনিয়ম কি আজকের অন্যায়কে বৈধতা দেয়? কোনোভাবেই না।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এখানেই—ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু সংস্কৃতি বদলায় না; বরং তা শতগুণে বৃদ্ধি পায়। গতকাল যারা নিপীড়নের শিকার ছিল, আজ তারাই নিপীড়নের ভাষা বহুগুণে ব্যবহার করছে। গতকাল যারা গণতন্ত্রের কথা বলেছে, আজ তারাই বিরোধী মতকে নির্বাচন থেকে বাদ দিতে চাইছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে দেশে কখনোই প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না।
আজ বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাই তাদের সমর্থকদের নির্বাচন করতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু আইন কোথায় বলে যে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকা মানেই একজন নাগরিক তার পেশাগত অধিকার হারাবে? যদি কোনো দল নিষিদ্ধও হয়, তাহলেও সেই দলের প্রতিটি সমর্থক স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হয়ে যায় না। আইনের মৌলিক নীতিই হলো—ব্যক্তিগত দায় ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারিত হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ নাগরিকের সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দিয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদ বলেছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। অথচ বাস্তবে এখন দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক পরিচয়ই নির্ধারণ করছে কার অধিকার থাকবে আর কার থাকবে না।
এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রনৈতিক সংকট। কারণ যখন পেশাজীবী সংগঠনগুলোও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন পুরো বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। জনগণ তখন আদালতকেও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে পারে না।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এই বাদ দেওয়ার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সহিংসতাকে বৈধতা দেয়।
যখন আপনি মানুষকে ভোটে হারানোর বদলে নির্বাচনেই অংশ নিতে দেবেন না, তখন আপনি গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে দমননীতি আর ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন। আর দমননীতি কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না; বরং আরও বিভক্তি, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের জন্ম দেয়।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠন। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ও পেশাগত সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নমতকে দমন নয়, মোকাবিলা করা হবে যুক্তি ও ভোটের মাধ্যমে। যদি কোনো আইনজীবী অতীতে অন্যায় করে থাকেন, ভোটাররা তাকে ভোট দেবে না। কিন্তু ভোটারদের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া গণতন্ত্রের প্রতি অবিশ্বাস ছাড়া আর কিছু নয়।
আইনজীবীরা শুধু একটি পেশার মানুষ নন; তারা রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার কাঠামোর অংশ। তাঁদের সংগঠন যদি অসহিষ্ণুতা, প্রতিশোধ ও রাজনৈতিক বর্জনের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়, তবে তা পুরো জাতির জন্য অশনিসংকেত।
বাংলাদেশ আজ একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের অধিকার নির্ধারণ করবে? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমান হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র কতটা সত্যিকারের গণতন্ত্র হবে।
লেখক পরিচিতি: বাংলাদেশি আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী; ফ্রান্স সরকারের “ম্যারিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ২০২৩” অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত; ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন “জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)”–এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
