চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নজিরবিহীন ‘অটো কমিটি’: একতরফা ভোটে বিএনপির শতভাগ জয়, সাংবাদিক লাঞ্ছিত

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নজিরবিহীন ‘অটো কমিটি’: একতরফা ভোটে বিএনপির শতভাগ জয়, সাংবাদিক লাঞ্ছিত
শেয়ার করুন

❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো


দীর্ঘ ১৩৩ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে যা কখনো ঘটেনি, এবার ঠিক তা-ই দেখল চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। চিরচেনা উৎসবমুখর পরিবেশের বদলে আদালতের চারপাশজুড়ে ছিল তুমুল উত্তেজনা, বিক্ষোভ আর পুলিশের কড়া পাহারা।

প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরকে মাঠের বাইরে রেখে শেষ পর্যন্ত একতরফা এক নির্বাচনের মাধ্যমে সমিতির ২১টি পদের সব কটিতেই জয়জয়কার হয়েছে বিএনপিপন্থী আইনজীবী ঐক্য ফোরামের।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ ১০টি পদেই প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া—যা আইনজীবী মহলে ‘অটো কমিটি’ হিসেবে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, সমিতির সভাপতি পদে তারিক আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক পদে মো. মঈনুদ্দীনসহ ৯ জন সম্পাদকীয় পদে বিনা বাধায় বিজয়ী হয়েছেন। তবে এই বিজয়কে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় বইছে বিতর্কের ঝড়।

একদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের জোরপূর্বক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ’ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর অনাস্থা এনে ভোট বর্জন করে এবং নির্বাচন স্থগিত চেয়ে আদালতের দ্বারে পর্যন্ত পৌঁছায়।

জামায়াতপন্থীরা ভোট বর্জন করলেও ব্যালট পেপারে তাদের নাম থেকে যাওয়ায় এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সমিতির ৪,৫০০ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন মাত্র ২,১৬০ জন, যা অর্ধেকেরও কম।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবী এইচ এম জিয়া উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সমিতির ১৩৩ বছরের ইতিহাসে কখনো এমন ভোটবিহীন কমিটি গঠনের নজির নেই। এমনকি করোনাকালেও এখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল। বর্তমান কমিশন একতরফাভাবে এই ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেছে।”

​তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব কামরুল ইসলাম চৌধুরী পাল্টা দাবি করেন, “রাষ্ট্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ বা সুযোগ নেই।”

নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে গত এক সপ্তাহ ধরেই আদালত এলাকায় কালো পতাকা মিছিল ও বিক্ষোভ করে আসছিলেন বিরোধী আইনজীবীরা। ভোটের দিনও সেই উত্তাপ কমেনি।

দুপুরের পর থেকে জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা ভোটকেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ মানববন্ধন করেন, আর আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা শাপলা ভবনের সামনে প্রতিবাদী গান গেয়ে এই একতরফা নির্বাচনের অভিনব প্রতিবাদ জানান।

ভোটের এই তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন দুই গণমাধ্যমকর্মী। চ্যানেল ওয়ান চট্টগ্রামের ব্যুরো প্রধান শাহনেওয়াজ রিটন ও ক্যামেরাপারসন অমিত দাসকে ভোট গ্রহণ কক্ষের ভেতরেই হেনস্তা করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাংবাদিক রিটন যখন লাইভ সম্প্রচার চলাকালীন মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা রৌশন আরার কাছে সাংবাদিকদের বাধাদানের বিষয়ে জানতে চান, তখনই কয়েকজন আইনজীবী উত্তেজিত হয়ে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের ভাষায় কথা বলছেন’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।

একপর্যায়ে লাইভের মাঝপথেই তাকে চরম অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ধাক্কা দিয়ে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়।

​ভোটারদের কম উপস্থিতি, বিরোধী শিবিরগুলোর বর্জন এবং সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়ার এই ঘটনা চট্টগ্রামের আইনজীবীদের এই ঐতিহ্যবাহী নির্বাচনকে এক চরম কলঙ্কিত অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিল বলে মনে করছেন সাধারণ আইনজীবীরা।

Visited 8 times, 1 visit(s) today