মুক্তিযুদ্ধ অবমাননা, সাইবার সন্ত্রাস ও মানহানির বহু মামলা বাতিল, রায় ও দণ্ডেও দায়মুক্তি

মুক্তিযুদ্ধ অবমাননা, সাইবার সন্ত্রাস ও মানহানির বহু মামলা বাতিল, রায় ও দণ্ডেও দায়মুক্তি
শেয়ার করুন

বিডি ডাইজেস্ট প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’। নতুন এই আইনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা ২০১৮ সালের ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এবং ২০২৩ সালের ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’-এর বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ধারার চলমান মামলা বাতিল করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব ধারায় ইতোমধ্যে আদালতে হওয়া দণ্ড ও জরিমানার রায়ও বাতিল করে আসামিদের পূর্ণ দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর আইনি পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। গত ১০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’ বিলটি পাস হয়, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে পুনঃপ্রণয়ন করা হয়েছে।

নতুন আইনের ৫০ ধারার ৫ উপধারা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ ধারা এবং ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের সমজাতীয় ধারাগুলোর অধীনে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে নিষ্পন্নাধীন থাকা মামলা, তদন্তাধীন কার্যধারা এবং পূর্ববর্তী সব দণ্ড ও জরিমানা সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য হবে।

এর ফলে ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ও প্রচারণা চালানো বা মদদ দেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া সব মামলা বাতিল হয়ে গেল। একই সাথে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার অভিযোগ (সাইবার সন্ত্রাস), ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচয় জালিয়াতি ও প্রতারণা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মানহানির মতো ধারার মামলাগুলো থেকেও অভিযুক্তরা আইনিভাবে রেহাই পেলেন।

তবে সাইবার সুরক্ষা আইনে জালিয়াতি ও হ্যাকিং সংক্রান্ত ধারাগুলো বহাল রাখা হয়েছে। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ (১৭ ধারা), কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইসে বেআইনি প্রবেশ (১৮ ধারা), সিস্টেমের ক্ষতিসাধন (১৯ ধারা), কম্পিউটার সোর্স কোড পরিবর্তন (২০ ধারা), ডিজিটাল জালিয়াতি (২২ ধারা), ডিজিটাল প্রতারণা (২৩ ধারা), বেআইনি ই-ট্রানজেকশন (৩০ ধারা), হ্যাকিং (৩২ ধারা) এবং কোম্পানি কর্তৃক অপরাধ সংঘটন (৩৫ ধারা) সংক্রান্ত মামলা ও আপিলগুলো আগের নিয়মেই সচল থাকবে।

নতুন এই আইনের ধারা ও দায়মুক্তির বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বাহাউদ্দিন ইমরান বলেন, “আগে আইন রহিত হলেও পূর্ববর্তী মামলাগুলো চলমান রাখা হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন আইনের মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারাসহ বেশ কিছু ধারা এবং তার অধীন হওয়া দণ্ড-জরিমানা পুরোপুরি বাতিল করা হলো। ফলে এই সংশ্লিষ্ট সব মামলার আসামিরা দায়মুক্তি পাবেন।”

অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় প্রতীক অবমাননার মামলা বাতিলের তীব্র সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জে আই খান পান্না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “দেশটা কি রাজাকারদের হাতে গেছে? রাজাকারের বাচ্চারা তো বলে জাতীয় সংগীত পরিবর্তন হওয়া দরকার। আমি কোনো সময়ই সাইবার নিরাপত্তা আইনের পক্ষে ছিলাম না, এটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণের পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের ওপর আঘাত করে, ৭১-এর চেতনার ওপর আঘাত করে—তারা কোন স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে, সেটাও দেখতে হবে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করতে এবং অপরাধীদের পার করে দিতেই সাইবার সুরক্ষা আইনে এই গণ-দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

Visited 16 times, 1 visit(s) today