জুলাই গেজেট স্ক্যাম: ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া আখতারুজ্জামান নাঈমকে বানানো হয় জুলাই শহীদ 

জুলাই গেজেট স্ক্যাম: ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া আখতারুজ্জামান নাঈমকে বানানো হয় জুলাই শহীদ 
শেয়ার করুন

তথ্যসূত্রঃ অচেনা একজন ও রুবেল খান

ঢাকা, ১০ জুন ২০২৬

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকার একটি ‘শহীদ গেজেট’ প্রকাশ করে, যেখানে আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ওই তালিকার একাধিক নাম নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। এমনই একটি নাম হলো মিরপুরের ব্যবসায়ী মোঃ আখতারুজ্জামান নাঈম — গেজেটের ক্রমিক নম্বর ৩০২।

জুলাই গেজেট স্ক্যাম নিয়ে আরও সংবাদঃ জুলাই গেজেট স্ক্যাম

নিহত ব্যক্তির পরিচয়

মোঃ আখতারুজ্জামান নাঈম পেশায় একজন খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগ করতেন। মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত হোটেল ঢাকা প্যালেসের অংশীদার হিসেবেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মিরপুর শাহ আলীর ‘এ’ ব্লক, গরিবে নেওয়াজ এলাকায় বসবাস করতেন।

 

ঘটনার বিবরণ: পরিবারের ভাষ্য

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আখতারুজ্জামান নাঈম ২৬ জুলাই ২০২৪ সকালে বাসা থেকে বের হন এবং আর ফেরেননি। পরদিন, অর্থাৎ ২৭ জুলাই রাত ৮টার দিকে তাঁর স্ত্রী সুমি আক্তার (বিলকিস)-এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়।

ওই কথোপকথনের মাত্র আধা ঘণ্টা পরে বিলকিসের ফোনে অপরিচিত এক ব্যক্তি জানান, নাঈম হোটেলের ছয় তলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেছেন এবং তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রাত পৌনে ১২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাঈমকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যু সনদ: চিকিৎসকের নথি কী বলছে

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইস্যু করা মৃত্যু সনদে চিকিৎসক মৃত্যুর কারণ হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন:

  • মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ: Primary Brain Injury (প্রাথমিক মস্তিষ্কের আঘাত)
  • আঘাতের উৎস: Fall from Height (উচ্চস্থান থেকে পতন)
  • আঘাত থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়: আড়াই ঘণ্টা

অর্থাৎ চিকিৎসকের সরকারি নথি অনুযায়ী, নাঈমের মৃত্যু হয়েছে উচ্চস্থান থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে — বুলেটের আঘাতে নয়।

 

পরিবারের সন্দেহ ও প্রশ্ন

নিহতের স্ত্রী বিলকিস ও ছোট ভাই আসাদুজ্জামান রায়হান জানিয়েছেন, নাঈম হোটেলের ছয় তলায় কেন গিয়েছিলেন তা তাঁরা জানেন না। তাঁরা আরও জানান, ছাদ থেকে পড়লে সাধারণত হাত-পা ভাঙার মতো আঘাত থাকার কথা — কিন্তু নাঈমের শরীরে তেমন কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। শুধু মাথার পেছনে গভীর ক্ষত ছিল, যা পরিবারের কাছে হাতুড়ির আঘাতের মতো মনে হয়েছে।

পরিবারের এই বক্তব্য মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে একটি ভিন্ন প্রশ্ন সামনে আনে — সেটি ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া, না ভিন্ন কোনো কারণ — তবে সেটি পুলিশের গুলির ঘটনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।


গেজেটে যে দাবি করা হয়েছে

শহীদ গেজেটে নাঈম সংক্রান্ত বিবরণে দাবি করা হয়েছে যে, ২৭ জুলাই মিরপুর ১ নম্বরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাবের সংঘর্ষ চলাকালে নাঈমের মাথার পেছন দিক থেকে সামনের দিক দিয়ে গুলি বের হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই দাবি অনুযায়ী নাঈম ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান।

দাবির সঙ্গে নথির বৈসাদৃশ্য

গেজেটের দাবি এবং চিকিৎসা নথির মধ্যে কমপক্ষে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে:

১. মৃত্যুর স্থান: গেজেটে দাবি করা হয়েছে মিরপুর ১-এর রাস্তায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যু সনদ বলছে আঘাতের আড়াই ঘণ্টা পর হাসপাতালে মৃত্যু।

২. মৃত্যুর কারণ: গেজেটে বন্দুকের গুলির কথা বলা হয়েছে। মৃত্যু সনদে কারণ লেখা আছে উচ্চস্থান থেকে পতন।

৩. মৃত্যুর সময়: স্ত্রীর সঙ্গে রাত ৮টায় ফোনে কথা হয়েছে। অথচ গেজেটে দাবি করা হয়েছে তিনি আন্দোলনে অংশ নিয়ে মারা গেছেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুলাই ২০২৪ ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তল্লাশি ও গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করলেও সেদিন রাজধানীতে — বিশেষত মিরপুর এলাকায় — পুলিশ বা যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে গুলিবর্ষণের কোনো নথিভুক্ত ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

পরিবারের পরবর্তী অবস্থান

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর নাঈমের পরিবার তাঁকে ‘শহীদ আন্দোলনকারী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য আবেদন করে। সূত্র জানাচ্ছে, ‘শহীদ’ পরিবারের জন্য ঘোষিত সরকারি সুবিধার মধ্যে রয়েছে একটি ফ্ল্যাট, মাসিক ভাতা, সরকারি চাকরি এবং এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র।

 

এই ঘটনায় কমপক্ষে তিনটি বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে:

১. আখতারুজ্জামান নাঈমের প্রকৃত মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি কী ছিল?

২. মৃত্যু সনদ ও গেজেটের বিবরণের মধ্যে কেন এত পার্থক্য?

৩. শহীদ গেজেট তৈরির প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই-বাছাই অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা?

এ প্রতিবেদনের জন্য নিহতের পরিবার, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং শহীদ তালিকা প্রস্তুতকারী কমিটির মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যায়নি।

Visited 36 times, 1 visit(s) today