❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো
টানা কয়েক দিনের রেকর্ডভাঙা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাত জেলায় প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে এ পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৩৯ জন।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১০ লাখ ২৩ হাজার মানুষ, আর পানিবন্দি রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে ভূমিধস ও বন্যায় ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে—স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা শরণার্থী উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ এর মধ্যে রয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলায় মারা গেছেন ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জন।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরীসহ জেলার ১৬টি উপজেলার প্রায় দুই লাখ পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর প্রায় ছয় লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে দুর্ভোগের শিকার। বন্দরনগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া ও আগ্রাবাদসহ একাধিক নিচু এলাকা এখনো জলমগ্ন।
স্থানীয় প্রশাসন ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে চলমান উদ্ধার তৎপরতায় বন্যার পানির তোড়ে ভেসে যাওয়া বহু মরদেহ পানির স্রোত কমার সাথে সাথে বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যাচ্ছে। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবারগুলো টানা কয়েকদিন ধরে নদী ও প্লাবিত এলাকায় তল্লাশি চালিয়েছে।
উদ্ধারকর্মীরা প্রতিটি মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন। দুর্গত এলাকায় বর্তমানে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ৪৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন, আর সরকারের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ ও শুকনা-রান্না করা খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
বান্দরবানে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, আর সেতু ভেঙে যাওয়ায় বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
ধারাবাহিক ভারী বৃষ্টির প্রভাবে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষাও ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী কয়েক দিনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে, ফলে পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা রয়েছে।
এক দশকের অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে প্রশ্নবিদ্ধ প্রস্তুতি
গত এক দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, সেখানে উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, উপকূলীয় সাইক্লোন শেল্টার নেটওয়ার্ক ও স্বেচ্ছাসেবক-ভিত্তিক সিপিপি (সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম) কাঠামোর কারণে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোতে—যেমন ২০২০ সালের আম্পান বা ২০২২ সালের সিত্রাংয়ে—প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক ডজনে নেমে এসেছিল।
বজ্রপাত শনাক্তকারী সেন্সর স্থাপন, ডব্লিউআরএফ মডেল ব্যবহার করে ৭-১০ দিনের অগ্রিম আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্য বাতায়নের মতো উদ্যোগগুলো এই অগ্রগতিরই অংশ।
তবে চট্টগ্রামসহ সাত জেলার সাম্প্রতিক এই বন্যা সেই অর্জনের একটি সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাসে যে নির্ভুলতা অর্জিত হয়েছে, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণজনিত নগর ও পার্বত্য বন্যার ক্ষেত্রে তার তুলনায় প্রস্তুতি ও পূর্বাভাস এখনো ততটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধস, দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢল মোকাবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার মতো পরিণত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত ও চরম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি এই ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই বন্যা তাই একদিকে যেমন দেখিয়ে দিল বাংলাদেশের দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের দ্রুততা—হাজারো আশ্রয়কেন্দ্র খোলা, ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধারকাজে সমন্বিত প্রচেষ্টা তার প্রমাণ—তেমনি এটি এই বার্তাও দিল যে, “শূন্য মৃত্যু”র লক্ষ্য এখনো সব ধরনের দুর্যোগে সমানভাবে অর্জিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ে যেভাবে পূর্ব-সতর্কতা ও নিরাপদ স্থানান্তরের মডেল সফল হয়েছে, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পূর্বাভাসভিত্তিক প্রস্তুতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
