বিতর্কিত ‘জুলাই গেজেট’এ শহীদ ৮৩৫, জাতিসংঘের দাবি ১৪০০ — বাকি নামগুলো কোথায়?

বিতর্কিত ‘জুলাই গেজেট’এ শহীদ ৮৩৫, জাতিসংঘের দাবি ১৪০০ — বাকি নামগুলো কোথায়?
শেয়ার করুন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দেড় বছর পরও স্পষ্ট কোনো সমাধান নেই। সরকারি গেজেট, জাতিসংঘের প্রতিবেদন আর বিভিন্ন সংগঠনের তালিকায় ব্যাপক গরমিল থাকায় প্রশ্ন উঠেছে— কোন সংখ্যাটি সঠিক, এবং বাকি নিহতদের পরিচয় আদৌ পাওয়া যাবে কি না।

– অচেনা একজন ও মার্ক রুবেন

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত জানুয়ারিতে “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের গেজেট” প্রকাশ করে, যেখানে শহীদের সংখ্যা ছিল ৮৩৪ জন। এরপর জুন মাসে আরও কিছু নাম যুক্ত হয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৮৪৩-৮৪৪ জনে। অন্যদিকে সরকার-অনুমোদিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তালিকায় নামের সংখ্যা প্রায় ৮৩৫।

এই সংখ্যার বিপরীতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের কার্যালয় (OHCHR)-এর তদন্ত প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে ১৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রধান উপদেষ্তা নিজেও বিভিন্ন সময়ে এই জাতিসংঘীয় সংখ্যা উদ্ধৃত করেছেন। তবে বিভিন্ন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করেছেন, যা বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে।

প্রায় ৫৫০-৬০০ জনের ফারাক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার— বাকি এই বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম-পরিচয় কোথায়, তাদের পরিবার কোথায়, আর কীভাবে জাতিসংঘ এই সংখ্যায় পৌঁছাল।

বেওয়ারিশ লাশ ও “গণকবর” প্রসঙ্গ

এই বিতর্কের মধ্যেই সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে রায়েরবাজার, জুরাইন, মাতুয়াইল, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ কবরস্থানে দাফন করা বেওয়ারিশ লাশ ও কথিত “গণকবর”-এর প্রসঙ্গ। এ নিয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য অনুযায়ী—

  • রায়েরবাজার কবরস্থান: ২০২৪ সালের ২২ জুলাই থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম মোট ১১৪ জনের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে, যা ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, সোহরাওয়ার্দীসহ কয়েকটি হাসপাতালের মর্গ থেকে এসেছিল। আদালতের নির্দেশে গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১১২টি লাশ কবর থেকে তুলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। সিআইডি জানিয়েছে, এই লাশগুলোর সবাই গুলিতে বা মারধরে নিহত হননি— এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ও বিষপানে মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। ৯টি পরিবারের আবেদনের বিপরীতে মাত্র ৮ জনের পরিচয় ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেছে। অথচ এদের সবাইকে “জুলাই গেজেট” এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
  • জুরাইন কবরস্থান: ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলে আসা ৫টি অজ্ঞাত লাশ দীর্ঘদিন মর্গে থাকার পর ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে এর একজনের পরিচয় শনাক্ত হয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
  • মাতুয়াইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নদীতে লাশ ভাসানোর দাবি: এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও একাধিক সূত্রে দাবি উঠলেও, স্বতন্ত্রভাবে যাচাইযোগ্য বা সরকারি নথিভুক্ত কোনো তথ্য এখনো সামনে আসেনি।

অর্থাৎ এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সরকারি বা তদন্তকারী সংস্থার নথিতে প্রকৃত অর্থে “গণকবর” (একসঙ্গে বহু মানুষের সমাধি) শনাক্ত হয়নি— বরং পাওয়া গেছে ব্যক্তিগতভাবে দাফন করা বেওয়ারিশ লাশ, যাদের একটি অংশ আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কি না তা এখনো অনিশ্চিত।

দুই ভিন্ন বয়ান

এই সংখ্যাগত ফারাক নিয়ে দুটি স্পষ্টত ভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছে।

একদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইনি প্রতিনিধিরা জাতিসংঘে চিঠি দিয়ে ১৪০০ সংখ্যাটিকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” ও “অত্যন্ত ভুল” বলে দাবি করেছেন, এবং সরকারি গেজেটের ৮৩৪-এর সংখ্যাকেই একমাত্র যাচাইযোগ্য পরিসংখ্যান হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই পক্ষের যুক্তি— বাড়তি সংখ্যার পেছনে জুলাই-আগস্ট জুড়ে হত্যা করা আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মি,  সড়ক দুর্ঘটনা, পারিবারিক কলহ কিংবা অন্য কারণে নিহতদেরও শহীদ হিসেবে গণনা করার অভিযোগ রয়েছে, এবং থানা আক্রমণে নিহত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতিসংঘ পক্ষ বলছে, জুলাই-আগস্টের সহিংসতার সময় বহু মৃত্যুর ঘটনা হাসপাতাল বা পুলিশি নথিতে না আসায়, প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা প্রক্রিয়াগতভাবেই কঠিন— এবং সে কারণেই জাতিসংঘের অনুমাননির্ভর সংখ্যা ও সরকারি গেজেটের নথিভুক্ত সংখ্যার মধ্যে ফারাক থাকা স্বাভাবিক।

জুলাই শহীদ গ্যাজেটে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের দ্বারা হত্যা করা সাধারন মানুষের নাম

শুধু পুলিশ সদস্যই না, জুলাই ষড়যন্ত্র সফল করতে হত্যা করা হয়েছে তথাকথিত আন্দোলনে অংশ নেয়া ব্যক্তিদেরকেও, তেমনই একজন হলেন বগুড়ার মো. সেলিম রেজা ওরফে সেলিম হোসেন। তিনি বগুড়া লাইট হাউজ স্কুল ও কলেজের প্রধান শিক্ষক ছিলো। তথাকথিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম থেকেই ছাত্রদের সাথে অংশ নিয়েছেন ও নানা রকম সহযোগিতা করেছেন। ৪ঠা আগস্ট বেলা ১১টায় আন্দোলনে গিয়ে দুই দফা টিয়ারশেল এবং একবার ককটেলের মুখে পড়ে বাসায় ফিরে যান সেলিম।

পরবর্তীতে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে আবারও আন্দোলনে যোগ দিতে সাতমাথা যাওয়ার একটু পরেই পুলিশের ধাওয়া খেয়ে সেলিম হোসেন স্বপক্ষীয় বিক্ষোভকারীদের একটা অংশের সাথে ডাকবাংলোর ভেতরে আশ্রয় নেন। সেখানেই বিক্ষোভকারী দুর্বৃত্তরা সেলিম হোসেনকে রড দিয়ে পিটিয়ে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। সেলিম হোসেনের নাম তথাকথিত শহীদ গেজেটের ৫১৮ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এই ঘটনায় নিহত সেলিম রেজা ওরফে সেলিম হোসেন এর বাবা সেকেন্দার আলী বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০১ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ৩৫০ জনকে আসামি করে ১৬ই আগস্ট (২০২৪) বগুড়ার সদর থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়ের করে।

শুধু পিটিয়ে বা কুপিয়েই না, আগুনে পুড়িয়েও নিরীহ মানুষদেরকে হত্যা করেছে বিকৃত মানসিকতার নির্মম আন্দোলনকারী জঙ্গি উম্মাদরা। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোডের হাজি ইব্রাহীম খলিল কমপ্লেক্সের (প্রিয়ম নিবাস) দ্বিতীয় তলায় আছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক, শিমরাইল শাখা। সেই ব্যাংকের ইন্টোরিয়রের কাজ করার জন্য গিয়েছিলো সোহেল আহমদ, আব্দুস সালাম, সেলিম মন্ডল, ফয়সাল মন্ডলসহ কয়েকজন।

ঐ একই ভবনের ৫ম তলায় ছিলো হাইওয়ে পুলিশের ব্যারাক। ২০শে জুলাই (২০২৪) দুপুরে জুলাই ষড়যন্ত্রের ‘বিক্ষোভকারী’দের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। তাদের লক্ষ্য করে ইট মারতে মারতে এক পর্যায়ে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে বিক্ষোভকারীরা টায়ার নিয়ে এসে পেট্রল ঢেলে ঐ ভবনের নিচতলায় ও সিঁড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ক্রমশঃ আগুন ছড়িয়ে যায় পুরো বিল্ডিংয়ে। সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার করা হয় এবং প্রাণ বাঁচাতে ভবনে থাকা অন্য লোকজন যে যার মতো করে বেরিয়ে আসে।

প্রচন্ড ধোঁয়া ও আগুনের উত্তাপে সোহেল, সালাম ও সেলিম বেরিয়ে আসতে পারে নাই। তারা জীবন্ত দগ্ধ হয়ে যায় ব্যাংকের ভেতরেই। জুলাই ষড়যন্ত্রকারীদের সহিংস আচরণের কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অনেক চেষ্টা করেও সেদিন আগুন নেভাতে পারেনি, পরদিন ২১ তারিখ আগুন নেভানো সম্ভব হলেও বিক্ষোভকারীদের কারণে উদ্ধারকাজ শুরু করা যায়নি। অগ্নিসংযোগের ২ দিন পর ২২শে জুলাই দুপুরে প্রিয়ম ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে সোহেল আহমদ, আব্দুস সালাম ও সেলিম মন্ডল এর অগ্নিদগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তথাকথিত গণহত্যায় সরকার ও আওয়ামী লীগের খুনের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাতে মৃত সোহেল আহমদকে ৪৪২, আব্দুস সালামকে ৪৮৫ এবং সেলিম মন্ডলকে ৫২৬ নম্বরে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই ঘটনার ১১ মাস পর ৩০শে জুন (২০২৫) সিদ্ধিরগঞ্জ থানার আব্দুস সালামকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে তার বড় ভাই আল-আমিন ও নিহত সেলিম মণ্ডলের বড় ভাই ওয়াজেদ আলী বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ৭০/৮০ জনকে আসামি করে আলাদা ২টি হত্যা মামলা দায়ের করে! অবাক করা ব্যাপার, আব্দুস সালামকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে একই থানায় একইদিন একই সময়ে ঐ ২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে! দুটি মামলার এজাহারে বাদী ভিন্ন হলেও নিহত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ‘আব্দুস সালাম’র নাম!

পরবর্তীতে একটি মামলার বাদী ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘নিহত আব্দুস সালাম আমার ভাই না। আমার ভাই সেলিম মণ্ডল। তার মৃত্যু গুলিতে নয়, আগুনে পুড়ে হয়েছে। আমি অশিক্ষিত মানুষ। এজাহার থানার পুলিশ লিখেছে, আমি কিছু জানিনা। শুধু স্বাক্ষর দিয়েছি।’

নিহত সোহেল এর মৃত্যুর ঘটনায় তার বন্ধু / সহকর্মী পরিচয় দেয়া আব্দুল হামিদ বাদী হয়ে ২২শে মে (২০২৫) সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এজাহারে লিখে ‘ব্যাংকের ভেতর কাজ করার সময় আওয়ামী লীগের লোকজন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। তখন প্রাণ বাঁচাতে আমি লাফিয়ে পড়লেও আমার বন্ধু সোহেল ভেতরে আটকা পড়ে আগুনে পুড়ে তার মৃত্যু হয়’।

২য় মামলার বাদী আল-আমিন বলেন, ‘আমার ভাই আব্দুস সালামকে আওয়ামী লীগের লোকজন গুলি করার পর ডাচ-বাংলা ব্যাংকে আশ্রয় নেয়। সে সময় ব্যাংকে আগুন ধরিয়ে দিলে আমার ভাই পুড়ে মারা যায়।‘

হিংস্র আন্দোলনকারীরা ট্রাকসহ আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে ট্রাকের হেল্পার কিশোর মো. আব্দুল মজিদকে। পরিবারের অভাবের কারণে ২০২৪ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে ট্রাকের হেলপার হিসেবে চাকরি নেয় মজিদ। ১৯শে জুলাই মালামাল নামিয়ে খালি ট্রাক নিয়ে চট্টগ্রামে ফেরার পথে হাজীগঞ্জ রেললাইন পার হতেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ব্যারিকেডে আটকা পড়ে মজিদ। এই সময় আন্দোলনকারী নামের দুর্বৃত্তরা অত্যন্ত শক্তিশালী দাহ্যপদার্থ দিয়ে মজিদকেসহ ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে। মুহূর্তেই আগুনে ভস্মীভূত হয় পুরো ট্রাক এবং গাড়িতেই অগ্নিদগ্ধ হয় কিশোর মজিদ। স্থানীয়রা মজিদকে উদ্ধার করে প্রথমে হাজীগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে।

আশংকাজনক অবস্থায় ২০শে জুলাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পর ২৫শে জুলাই সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় মজিদ। মজিদের হত্যা দায় শেখ হাসিনার উপরে চাপাতে তার নাম গেজেটের ৩৮ নম্বরে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

 

যশোরে হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল’ লুট করতে গিয়ে
আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত ২৩ জনের নাম জুলাই গেজেটে

পূর্বের প্রতিবেদনঃ যশোরের জাবির হোটেল লুটতে গিয়ে নিহত ১৯ জনের নাম উঠেছে জুলাই শহীদ’দের তালিকায়

৫ই আগস্ট জুলাই ষড়যন্ত্রের প্রথম পর্ব সফল হয় প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ এবং সেনাপ্রধানের দেশ ও জনগণের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। সেদিন বিজয় উৎসব পালনের নামে তথাকথিত আন্দোলনকারীরা সারাদেশে তাদেরই প্রায় অর্ধশতাধিক সহযোগীকে আগুনে পুড়িয়ে, কুপিয়ে হত্যা করে। এদেরকেই আবার তথাকথিত আন্দোলনে শহীদ ঘোষণা করে গেজেটভুক্ত করা হয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এসব দূর্বৃত্তদের পরিবারকে দেয়া হয় মোটা অংকের অর্থ। ফ্ল্যাট মাসিক ভাতা ও চাকরিসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।

৫ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রী জীবন বাঁচাতে দেশত্যাগের পরে বিকালে সাড়ে ৩টার দিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে যশোর শহরে একটি বিজয় মিছিল হয়। ঐ মিছিল থেকে দুর্বৃত্তরা যশোরের চিত্রা মোড়ে অবস্থিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য শাহিন চাকলাদারের ১৬ তলাবিশিষ্ট অভিজাত পাঁচ তারকা ‘হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল’ এ হামলা করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। বালিশ, কাঁথা, বিছানা চাদর থেকে শুরু করে হোটেলের খাট, ফ্রিজ, এসি, টিভিসহ বিলাসবহুল সমস্ত জিনিসপত্র লুটপাট শুরু করে।

দুর্বৃত্তদের একটি গ্রুপ হোটেলটির বেসমেন্ট থেকে উপরে উঠে ১২, ১৩ ও ১৪ তলাসহ উপরের বিভিন্ন ফ্লোরে ভাঙচুর লুটপাট ও হোটেলের বারে মদ্যপানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন নিচে অবস্থান করা আরেকটি গ্রুপ বেসমেন্ট ও গ্রাউন্ডফ্লোরে গান পাউডার ও পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহুর্তে সেই আগুন ছড়িয়ে যায় পুরো ১৬ তলা ভবনে। ফলে ওপরের ফ্লোরে থাকা অনেকেই আগুন ও ধোঁয়ার কারণে নিচে নামতে পারেনি।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে স্বীকার করা হয় এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয় এই ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার এক নাগরিকসহ ২৪ জন নিহত হয় এবং গুরুতর আহত হয় প্রায় সমসংখ্যক। নিহত ২৩ জন লুটপাটকারীর নামই তথাকথিত আন্দোলনে শহীদ হিসাবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে!

তথাকথিত শহীদ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গেজেট নং- ২৯ রোকনুজ্জামান রাকিব, গেজেট নং- ৩০ মো. শাওয়ান্ত মেহতাব (প্রিয়), গেজেট নং- ৩১ মো. তারেক রহমান, গেজেট নং- ৩২, মো. আলামিন বিশ্বাস, গেজেট নং- ৬৯ আবরার মাসনুন নীল, গেজেট নং-১১০ মো. ইউসুপ আলী, গেজেট নং- ১১৩ মো. আব্দুল্লাহ ইবনে শহীদ, গেজেট নং- ১১৫ মো. মেহেদী হাসান আলিফ, গেজেট নং- ১৭৭ সাকিব, গেজেট নং- ৩৩৩ মো. সাকিবুল হাসান মাহি, গেজেট নং- ৩৩৫ রুহান ইসলাম, গেজেট নং- ৩৩৬ সামিউর রহমান সাদ, গেজেট নং- ৩৩৮ মেহেদী হাসান, গেজেট নং- ৩৩৯ ফয়সাল হোসেন, গেজেট নং- ৩৪১ মো. হাফিজ উদ্দিন, গেজেট নং- ৩৪২ মো. সোহানুর রহমান, গেজেট নং- ৩৪৩ মো. সিফাত ফেরদৌস ওরফে সিফাত হোসেন, গেজেট নং- ৩৪৭ রাসেল রানা, গেজেট নং- ৫২২ ফজল মাহাদী চয়ন, গেজেট নং- ৬৯১ মো. রিয়াদ শেখ, গেজেট নং- ৭৯৬ সৈয়দ মিথুন মোরশেদ, গেজেট নং- ৭৯৮ মো. খালিদ হোসেন শান্ত এবং গেজেট নং- ৮৪৩ আঃ আজীজ চাঁন।

স্থানীয়ভাবে এই হামলা, লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে শতাধিক মৃত্যুর দাবি থাকলেও বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত নিহতের সর্বমোট ২৪ জনের নাম প্রকাশ হলেও আলাদাভাবে নিহত আরো ৮ জনের নাম খুঁজে পাওয়া যায় যাদের নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সেই ৮ জন হলোঃ ১) আল আমিন, ২) আবুল বাসার, ৩) রিফাত আহমেদ রিয়াদ, ৪) আলমগীর হোসেন আলম, ৫) আবু সাঈদ রাসা, ৬) মাহিন, ৭) সেজান হোসেন এবং ৮) রাতুল।

এই ঘটনায় ১৮ই আগস্ট (২০২৪) ‘জাবির ইন্টারন্যাশনাল’ এর মালিক শাহীন চাকলাদারের চাচাতো ভাই সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু জাবির ইন্টারন্যাশনাল লুটপাট ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ২শ’ সন্ত্রাসীকে আসামি করে একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দায়ের করা এই মামলায় যশোর পুলিশ অপরাধী হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মী-সমর্থকদেরকেই আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করছে।

আরও বিস্তারিতঃ জুলাই গেজেট স্ক্যাম

এখন পর্যন্ত যা নিশ্চিত

  • সরকারি গেজেটে নথিভুক্ত শহীদের সংখ্যা: ৮৩৪-৮৪৪ জন (সময়ে সময়ে সংশোধিত) যার মাঝে ২০০ অধিক ব্যাক্তির মৃত্যু জুলাই শহিদ সংজ্ঞার সাথে মিল নাই।
  • জাতিসংঘের OHCHR প্রতিবেদনে অনুমিত সংখ্যা: ১৪০০-এর বেশি
  • রায়েরবাজার ও জুরাইনে চিহ্নিত বেওয়ারিশ লাশ: ১১৭ জন, যাদের মধ্যে মাত্র ৯ জনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা হয়েছে এবং ৮-৯ জনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে
  • মাতুয়াইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ কবরস্থান বা নদীতে লাশ ভাসানোর দাবি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি বা তদন্তকারী সংস্থার তথ্য এখনো নেই

সব মিলিয়ে ৫৫০-৬০০ জনের নাম-পরিচয়ের ফারাক এখনো অমীমাংসিত, এবং এটি একটি চলমান, উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়— যেখানে পক্ষ-বিপক্ষ উভয়েই নিজ নিজ অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে প্রয়োজন স্বাধীন, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত— যা এখনো সম্পন্ন হয়নি।

এখন প্রশ্ন  উঠছে জাতিসংঘের OHCHR কি তাদের দাবিকৃত ১৪০০ নিহতের সংখ্যা প্রমানে যথাযথ তদন্ত ও অনুসন্ধান করেছে? যদি করে থাকে তাহলে জাতিসংঘের OHCHR কেন বাকি নিহতদের নাম পরিচয় ও তথ্য উপাত্ত দিয়ে জুলাই শহিদের সংখ্যা ও রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করছে না?

Visited 11 times, 1 visit(s) today