সারাদেশে ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগে চরম অনিয়ম: রাজনৈতিক প্রভাব ও বহিরাগতদের দাপটে প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষা

সারাদেশে ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগে চরম অনিয়ম: রাজনৈতিক প্রভাব ও বহিরাগতদের দাপটে প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষা
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের উদ্যোগ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন উপজেলায় চলমান তথ্যসংগ্রহকারী, সুপারভাইজার ও আইটি সুপারভাইজার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে আসছে।

পটুয়াখালীর বাউফল ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার দুটি পৃথক ঘটনা সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বাউফলে পরীক্ষা কেন্দ্রে বহিরাগত প্রবেশ, ভিডিও ধারণ ও সংঘর্ষ

২৫শে জুলাই শনিবার বাউফল উপজেলা পরিষদ হলরুমে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় শুমারির সুপারভাইজার ও আইটি সুপারভাইজার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে পরীক্ষা চলাকালেই অভিযোগ ওঠে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া এক বহিরাগত ব্যক্তি মোবাইল ফোন নিয়ে কিছু সময়ের জন্য পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ করেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলম তালুকদারের ছেলে রাইয়ান আকাশ।

একই সময়ে উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল্লাহ আল ফাহাদ বাইরে থেকে পরীক্ষাকক্ষের ভিডিও ধারণ করেন। দুটি ঘটনাকেই নিয়মবহির্ভূত উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পরীক্ষার্থীরা।

পরীক্ষা শেষে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে আবদুল্লাহ আল ফাহাদ ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সদস্যসচিব সাদিকুজ্জামান রাকিবের মধ্যে বাকবিতণ্ডা থেকে প্রকাশ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনেছে।

বিধি বহির্ভূতভাবে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিএনপি নেতার পুত্র

নিয়োগে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা যায়, তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে একটি প্রার্থীর তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল। যদিও সংশ্লিষ্টরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রাইয়ান আকাশ স্বীকার করেন যে তিনি পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছিলেন, তবে দাবি করেন তিনি অল্প সময় অবস্থান করেছেন। তবে সরকারি কোন বিধিমালার আওতায় তিনি একজন বহিরাগত হিসেবে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন—সে প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক তসলিম তালুকদার দাবি করেন, তারা কোনো প্রার্থীর তালিকা দেননি। কেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন। তার দাবি, ইউএনও নিরপেক্ষ নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন।

মারামারিতে আহত পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব সাদিকুজ্জামান রাকিব

পরীক্ষার্থী জসিম উদ্দীন অন্তু বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্তদের বাইরে অন্য কারও পরীক্ষাকক্ষে থাকা এবং বাইরে থেকে ভিডিও ধারণ—দুই ঘটনাই পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বস্তি ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। তার ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ড পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে।

প্রশাসনের ভাষ্য

বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, পরীক্ষাকক্ষে অননুমোদিতভাবে কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। অভিযোগের বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হবে।

অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।


সাতকানিয়ায় ভাইভা বোর্ডে বহিরাগত, প্রশ্নের মুখে নিয়োগের নিরপেক্ষতা

একই দিনে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্যসংগ্রহকারী নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষাতেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ভাইভা বোর্ডে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় একটি বেসরকারি কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পরিচালক তৌহিদুল হক ইকন দীর্ঘ সময় উপস্থিত থেকে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন করেন বলে অভিযোগ করেন একাধিক চাকরি প্রত্যাশী।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ইকন জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে জড়িত।

পরীক্ষার্থীদের ভাষ্য, প্রথমে তারা তাকে সরকারি কর্মকর্তা ভেবেছিলেন। পরে জানতে পারেন তিনি কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। ফলে একজন বহিরাগত কীভাবে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার বোর্ডে বসে প্রশ্ন করেন—তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ: ‘এভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরীক্ষার্থী বলেন, সরকারি চাকরির মৌখিক পরীক্ষা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। সেখানে দায়িত্বহীন কোনো ব্যক্তি বোর্ডে বসলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে সুস্পষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানান।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য এবং কিছু প্রশ্ন

স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, তৌহিদুল হক ইকন মূলত টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার জন্য পরীক্ষকদের সঙ্গে ছিলেন।

তবে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার ভাইভা বোর্ডে কোনো বহিরাগত উপস্থিত থাকতে পারেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তিনি দেননি।

অন্যদিকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাচন কমিটির সভাপতি ও সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

সারাদেশে একই ধরনের অভিযোগ, বাড়ছে আস্থার সংকট

সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে অতীতেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। এবার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাউফল ও সাতকানিয়ার ঘটনাগুলো সেই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে।

দুই জেলার ঘটনাতেই বহিরাগতদের সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন চাকরি প্রত্যাশীরা।

তাদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সামান্য অনিয়মের অভিযোগও হাজারো শিক্ষিত বেকারের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।

Visited 9 times, 1 visit(s) today