বিশ্লেষণ || ইউনূস-তারেকের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে চরম গ্যাস সংকটে বাংলাদেশ

বিশ্লেষণ || ইউনূস-তারেকের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে চরম গ্যাস সংকটে বাংলাদেশ
শেয়ার করুন

আমিনুল হক পলাশ
সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক


গত কিছুদিন ধরেই দেশের অন্যতম প্রধান সংকট হল গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া। গ্যাসের অভাবে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা, বেকার হচ্ছে হাজারো মানুষ। অনেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কিংবা বাতিল করেছে কার্যাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর কতটা বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

গ্যাসের অভাবে বাংলাদেশের ৬টি সরকারি ইউরিয়া সার কারখানার ৫টি বন্ধ আছে। এর ফলে সামনের মৌসুমে সারের জন্য হাহাকার করবে কৃষকরা, কৃষি উৎপাদন নামবে তলানীতে। গ্যাসের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, তীব্র আকার ধারণ করছে লোডশেডিং। সংকটে গ্যাস না পাওয়ায় রাস্তাঘাটে যানবাহনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, গণপরিবহনে বাড়ছে ভোগান্তি।

কেন এই গ্যাস সংকট। কার দায় এতে? চলুন সহজে বোঝার চেষ্টা করি।

বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০মিলিয়ন ঘনফুট। এর মাঝে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৬০০-১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই সরবরাহের পরিমাণ দিনকে দিন কমছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দৈনিক উৎপাদন রেকর্ড হয়েছিলো ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এরপর থেকে এটি ধারাবাহিভাবে কমতে শুরু করে।

বাড়তি গ্যাসের চাহিদা মেটানোর জন্য আওয়ামী লীগ সরকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০১৮ সালে এলএনজি থেকে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়।

এলএনজি সরবরাহের জন্য কাতার এনার্জি, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করা হয়। পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি ক্রয় করা হয়। জাতীয় গ্রিডে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হয় মহেশখালীর অদূরে নোঙ্গর করা দুটি ভাসমান টার্মিনাল যা এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) থেকে। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং অপরটি সামিট গ্রুপ। এই দুই এফএসআরইউ থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গত ২১শে জুলাই এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এফএসআরইউতে আগুন লাগে। খুবই সংবেদনশীল একটি স্থাপনা হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ১৫ মিনিট ধরে এই আগুন জ্বলে। এতে ইউনিটটির পাওয়ার কন্ট্রোল ও ইন্সট্রুমেন্টেশন ক্যাবল নষ্ট হয়ে আউট অব সার্ভিস হয়ে পড়ে। ফলে এই ইউনিট থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আর এতেই এলএনজি থেকে আসা ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ নেমে যায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

অর্থাৎ দৈনিক ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ২১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো যা অর্ধেকের একটু বেশি। কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে সেটি এখনো নিশ্চিত না।

এতটুকু পড়ে বলতে পারেন, এটি তো নিছকই দুর্ঘটনা, দায় তাহলে কার? চলুন দায় খোঁজার চেষ্টা করি।

গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ এবং নির্বিঘ্নে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জন্য আওয়ামী লীগ সরকার জরুরী ভিত্তিতে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তৃতীয় এফএসআরইউ ইউনিটের চুক্তি করেছিলো সামিট গ্রুপের সাথে। এই তৃতীয় এফএসআরইউ ইউনিটের সক্ষমতা ছিলো ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। জরুরী ভিত্তিতে এই এফএসআরইউ ইউনিট স্থাপনের জন্য সামিট গ্রুপ ভেসেল ক্রয় সম্পন্ন করে এবং সেটার মডিফিকেশনের জন্য চীনে ডকইয়ার্ডও ভাড়া করে।

এছাড়াও প্রয়োজনীয় লিড ইন্সট্রুমেন্ট যোগাড়ও সম্পন্ন করে। এই ইউনিট স্থাপন শুরু হবার কথা ছিলো ২০২৪ এর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এবং সম্পন্ন হতো এপ্রিল মাসে। উল্লেখ্য, এফএসআরইউনিট স্থাপনের কাজ শীতকালেই করতে হয়, কেননা অন্যসময় সমূদ্রে যে পরিমাণ স্রোত থাকে তাতে এটি করা কঠিন।

অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা দখলের পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে সামিট গ্রুপের সাথে করা তৃতীয় এফএসআরইউ চুক্তি বাতিল করে। যুক্তি দেয়া হয়েছিলো এটার প্রয়োজন নেই। এছাড়াও প্রশ্ন তোলা হয়েছিলো দরপত্রের প্রক্রিয়া এবং সামিটের সক্ষমতা নিয়ে। অথচ সামিট ২০১৯ সাল থেকে সফলতার সাথে এফএসআরইউ ইউনিট পরিচালনা করে আসছে এবং বর্তমানে এটিই একমাত্র ভরসা।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপ আদালতে মামলা করেছে যা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাতিল করা হয় সামিট গ্রুপের সাথে করা এলএনজি আমদানির চুক্তিও। হাস্যকর ব্যাপার হলো, সেখানে যুক্তি দেখানো হয় তৃতীয় আরেকটি এফএসআরইউ ইউনিট ছাড়া সামিট থেকে এলএনজি আমদানির প্রয়োজন নেই।

অর্থাৎ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের তৃতীয় এফএসআরইউ ইউনিট বাতিলের সিদ্ধান্তই বর্তমান গ্যাস সংকটের মূল কারণ। কিন্তু তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত ২৮শে জুলাই সংবাদ সম্মেলনে দোষ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন আওয়ামী লীগের উপর। আওয়ামী লীগ সরকারের যথাযথ উদ্যোগের অভাবেই নাকি গ্যাস সংকট তৈরি হচ্ছে।

অথচ দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে আওয়ামী লীগ সরকার সম্ভাব্য সব কিছুই করেছে। ইউনূসের অপরিমাণদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই বাংলাদেশের আজকের সংকট। তারেক রহমানের সরকারও এই ধারাবাহিকতাই ধরে রেখেছে।

এখানে আরেকটা প্যাটার্ন খুবই লক্ষণীয়। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা বাণিজ্য চুক্তির শর্তানুযায়ী আগামী ১৫ বছরের জন্য এলএনজি ক্রয়ের চুক্তি করা হয়েছিলো এক্সিলারেট এনার্জির সাথে, যা ছিলো ২০২৩ সালের বর্ধিত সংস্করণ। এই চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালে ১২ কার্গো এবং ১৫ বছরে মোট ২৩২ কার্গো এলএনজি সরবরাহের কথা থাকলে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২ কার্গো সরবরাহ করেই হরমুজ প্রণালীর সংকটের অজুহাতে ফোর্স মেজ্যুর ঘোষণা করেছে এক্সিলারেট এনার্জি। অর্থাৎ তারা আর কোন গ্যাস এখন পর্যন্ত সরবরাহ করে নাই।

অথচ বর্তমান সরকার গত ২৮শে জুলাই নতুন করে মার্কিন কোম্পানি গানভর ইউএসএর এলএলসির সাথে ১৩ বছরে ৭৮ কার্গো এলএনজি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। এতে খরচ হবে ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা যা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। একটি মার্কিন কোম্পানি বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহে ব্যর্থ হবার পরেও কেন আরেকটি বেসরকারি মার্কিন কোম্পানির সাথে জিটুজি চুক্তি করতে হলো? কার স্বার্থে? তারা কি আদৌ গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে?

মজার ব্যাপার হচ্ছে চুক্তি মার্কিন কোম্পানির সাথে হলেও তারা গ্যাস সরবরাহ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সোর্সিং করে। তাহলে কেন সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের দেশের থেকে করা হচ্ছে না?

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিকে একমুখী করে ফেলার কারণেই বর্তমান গ্যাস সংকট। ক্ষমতায় বসতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে ইউনূস-তারেকের যেকোন মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রকে তুষ্ট রাখার এই খেলার নির্মম বলি বাংলাদেশ। এখনো আমরা শুধু সমস্যার কীয়দাংশটাই দেখতে পাচ্ছি। ভবিষ্যতে আরো অনেক বিপদ আসছে বাংলাদেশের সকল খাতে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today