ফিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত ইউরোপের ৫৫ দেশের

ফিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত ইউরোপের ৫৫ দেশের
শেয়ার করুন

জরুরি এক বৈঠকের পর উয়েফা ফিফার  সব প্রতিযোগিতা বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বিতর্কিত পরিকল্পনার প্রতিবাদেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত। ইনফান্তিনো ২০ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার বিনিময়ে একটি প্রাইভেট ইকুইটি গ্রুপের কাছে ফিফার শেয়ার বিক্রি করতে চান। উয়েফা সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব ‘পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান’ করেছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের মতো শক্তিশালী ফুটবল দেশগুলোকে আর ছেলে বা মেয়েদের কোনো বিশ্বকাপেই দেখতে পাওয়া যাবে না।

ফিফার ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইনফান্তিনো ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস’ (FFE)-এর শেয়ার বিক্রির কথা জানান। এই শেয়ারের বিনিময়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ, সম্প্রচার সত্ত্ব এবং নানা বাণিজ্যিক চুক্তির ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাবে।

আমেরিকান বিনিয়োগকারী জশ কুশনার এবং বিখ্যাত ব্যাংক জেপি মরগ্যানের সমর্থনে আসা এই প্রস্তাব মেনে নিলে, ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটি ২০৩৭ সালের মধ্যে ৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পাবে। ইনফান্তিনো আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই প্রস্তাব মেনে নেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন।

৫৫ দেশের একজোটে তীব্র ক্ষোভ

উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশকে নিয়ে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে ৫০টিরও বেশি দেশ সরাসরি ফিফার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেয়। এরপরই ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা জানিয়ে দেয়, এই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল না করা পর্যন্ত তারা ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না।

এই সিদ্ধান্তের প্রথম বড় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বরে, পোল্যান্ডে আয়োজিত অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপে।

উয়েফার কড়া হুঁশিয়ারি: ‘বিশ্বকাপ বিক্রির জিনিস নয়’

উয়েফা এবং এর ৫৫টি সদস্য দেশের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়:

‘উয়েফা এবং এর ৫৫টি সদস্য দেশ আজ এক সুতোয় বাঁধা। আমরা ফিফার প্রতিযোগিতা ও বিশ্বকাপের মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার এই প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাখ্যান করছি। বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ বিনিয়োগ পণ্য নয়। এটি ফুটবলের অন্যতম বড় ঐতিহ্য, যা বিশ্বজুড়ে খেলোয়াড় ও সমর্থকদের শ্রমে গড়ে উঠেছে। এর কোনো অংশই প্রাইভেট কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।

বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়, প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে কখনোই এমন উদ্যোগ নেওয়া হবে না—এমন আইনি গ্যারান্টি না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ইউরোপীয় দল ফিফার মাঠে নামবে না।

গোপন আঁতাত ও ফিফার স্বৈরাচারী মনোভাব

কোনো পূর্ব-আলোচনা ছাড়া এমন স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেওয়াকে ফিফার চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে উয়েফা।

বিবৃতিতে উয়েফা উল্লেখ করে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ নিয়ে গোপনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তা হঠাৎ করে সদস্য দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। উয়েফার মতে, এটি কোনো গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা জাহির করার এক অপচেষ্টা।

বিনিয়োগকারীদের হাতে ফুটবল তুলে দেওয়ার আশঙ্কা

বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আগমন নিয়ে উয়েফা গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছে। উয়েফার মতে, বাইরের বিনিয়োগকারীরা মালিকানা পেয়ে গেলে ফুটবল চিরতরে তার আসল রূপ হারাবে। খেলার উন্নয়নের চেয়ে কোম্পানির লভ্যাংশ বাড়ানোই তখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে।

খেলার ক্যালেন্ডার, টুর্নামেন্টের নিয়মাবলি এবং ফুটবলের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই তখন চালিত হবে শেয়ারহোল্ডারদের লাভের ওপর ভিত্তি করে।

উয়েফা তাদের শক্ত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে:

‘সাময়িক টাকার লোভে ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক দেওয়া যাবে না। খেলোয়াড়, ক্লাব কিংবা সমর্থকদের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে কোনো কোম্পানির পকেট ভরানো সম্ভব নয়। ইউরোপের অবস্থান পরিষ্কার—আমরা এই মডেলকে কখনোই বৈধতা দেব না।’

Visited 1 times, 1 visit(s) today