❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কিরগিজস্তানের বিশকেকে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলন, যেখানে একই মঞ্চে দেখা গেল বিশ্বের প্রভাবশালী তিন নেতা—চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে।
তা সত্ত্বেও সম্মেলন থেকে বড় কোনো চুক্তি বা যুগান্তকারী ঘোষণা আসেনি, এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলার মতো তেমন কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি।
চীনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এসসিওর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, রাশিয়া, ভারত, মধ্য এশিয়ার কয়েকটি রাষ্ট্র, পাকিস্তান, ইরান ও বেলারুশ। এই দেশগুলো মিলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক প্রতিনিধিত্ব করে।
সংস্থাটি পর্যবেক্ষক ও অংশীদার দেশ হিসেবেও অন্য রাষ্ট্রগুলোকে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। এবারের সম্মেলন সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার ২৫তম বার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত হলো।
কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের ফেলো তেমুর উমারভের মতে, এসসিও সম্মেলনগুলো মূলত প্রকৃত সিদ্ধান্তের চেয়ে ভাবমূর্তি তৈরির দিকেই বেশি মনোযোগী। বছরের পর বছর ধরে যেসব চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি স্বাক্ষরিত হয়েছে, বাস্তবে তার বাস্তবায়নের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
তার ভাষায়, সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি হাতিয়ার, যেখানে বাস্তব ফলাফলের চেয়ে দৃশ্যমান উপস্থিতির গুরুত্ব বেশি।
তবে উমারভ মনে করেন, এই কাঠামো অন্য দেশগুলোর জন্যও একটি সম্ভাব্য মডেল হতে পারে—যেখানে বাস্তব প্রতিশ্রুতি পূরণের দায় ছাড়াই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গুরুত্ব ও কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা যায়।
মার্কাসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ও এসসিও বিষয়ক গ্রন্থের লেখক আভা শেয়ার্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তথাকথিত গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ এসসিওতে যোগ দিতে বা অংশীদার হতে আগ্রহী, যা চীনকে নিজস্ব বহুপাক্ষিক কাঠামোর জনপ্রিয়তা তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর নেতারাও এই মঞ্চে উপস্থিত থেকে বিশ্বের কাছে নিজেদের বিচ্ছিন্ন নয় বরং শক্তিশালী মিত্র-বেষ্টিত হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী।
সি চিন পিংয়ের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে বিশ্ব এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি—এমন একটি বার্তা, যা পশ্চিমা প্রভাবের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
একই বার্তা তিনি বছর তিনেক আগেও পুতিনকে দিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জি-৭ সম্মেলনের সমান্তরালে এসসিও সম্মেলন আয়োজন করে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রায়ই পশ্চিমা জোটের তুলনায় এই সংস্থাকে অধিক কার্যকর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
এই সম্মেলন শুধু বড় শক্তিগুলোর জন্যই নয়, ছোট ও মধ্যম আকারের দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ। এবারের আয়োজক দেশ কিরগিজস্তানের জন্য এটি তাদের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন।
রাশিয়া, চীন, ইরান ও আফগানিস্তানের মাঝামাঝি ভূরাজনৈতিকভাবে জটিল অবস্থানে থাকা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম নতুন আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হয়তো ভারতের। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান, যা কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্টের আগের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, ইউরেশীয় অঞ্চলে নিজের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে ভারত এসসিওকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
চীন-রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান নৈকট্য ভারতের জন্য একটি ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয়, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে।
তাই রাশিয়ার সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক বজায় রাখা—বিশেষত সামরিক সরঞ্জাম আমদানির প্রয়োজনে—ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সম্মেলনের পরপরই সি চিন পিং মিশর সফরে যান এবং দুই সপ্তাহ পর দিল্লি সফরের কথা রয়েছে ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে।
এছাড়া, প্রায় তিন সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ওয়াশিংটনে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে সি চিন পিংয়ের।
বিশ্লেষকদের ধারণা, দিল্লি সফরের সময় হয়তো মোদি নিছক প্রতীকী উপস্থিতির বাইরে গিয়ে বাস্তব কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করবেন।
সব মিলিয়ে, বিশ্লেষকদের অভিমত—এসসিও এখনো মূলত একটি “ইমেজ বিল্ডিং” মঞ্চ হিসেবেই কাজ করছে, যেখানে বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের চেয়ে কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা ও প্রতীকী ঐক্যের প্রদর্শনই মুখ্য বিষয়।
