কোথায় কত দামে ডিম বিক্রি হবে, নিয়ন্ত্রণ করে ‘হোয়াটসঅ্যাপ সিন্ডিকেট’: নীরব প্রশাসন

কোথায় কত দামে ডিম বিক্রি হবে, নিয়ন্ত্রণ করে ‘হোয়াটসঅ্যাপ সিন্ডিকেট’: নীরব প্রশাসন
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


মাছ-মাংসের বাজারে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তত ডিমের ওপর ভরসা করে কিছুটা আমিষের চাহিদা মেটানোর সুযোগ থাকবে—এমনটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে যখন একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ছে, তখন সেই ডিমের দামও এখন হালিপ্রতি ৫৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

অর্থাৎ এক ডজন ডিম কিনতে একজন ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা। একসময় যে ডিমকে ‘গরিবের আমিষ’ বলা হতো, সেটিও এখন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ ডিমের বাজারে এমন মূল্যবৃদ্ধির কারণ কী? এর পেছনে কি প্রাকৃতিক কোনো কারণ রয়েছে, নাকি সক্রিয় কোনো অদৃশ্য সিন্ডিকেট? খতিয়ে দেখা যাক ডিমের বাজারে এই অস্বাভাবিক দাম বাড়ার নেপথ্যের কারণ।

সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে ডিম

রাজধানীতে নিম্ন আয়ের এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যাদের সংসার চলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয়ে। দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করা একজন মানুষের জন্য যেখানে নিত্যদিনের সংসার খরচ চালানোই কঠিন, সেখানে মাছ-মাংস কেনা অনেকটাই বিলাসিতার মতো। .

এমন পরিবারের জন্য ডিমই তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য আমিষের উৎস হওয়ার কথা। কিন্তু সেই ডিমের দামও এখন বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ফার্মের সাদা ডিম ডজনপ্রতি ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বাদামি ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা। তবে পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে গিয়ে এক হালি ডিম কিনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা দিয়ে। সেই হিসাবে এক ডজন ডিমের দাম দাঁড়াচ্ছে ১৬৫ টাকা।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ডিমের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। শুধু এক মাস নয়, গত দুই মাস ধরে ডিমের এই বাড়তি দাম অব্যাহত রয়েছে।

অথচ সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব কমাতে কার্যকর বড় কোনো পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়।

বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে হোয়াটসঅ্যাপ সিন্ডিকেট

কিন্তু হঠাৎ করে ডিমের দাম এতটা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী? খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, পাইকাররাই নিজেদের ইচ্ছামতো ডিমের দাম বাড়াচ্ছেন। কারওয়ান বাজারের এক খুচরা বিক্রেতার কথায়, পাইকাররা দুদিন দাম কমালেও তিন দিন বাড়িয়ে দেন।

তবে ডিমের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এর চেয়েও গভীর একটি তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

অনুসন্ধান অনুযায়ী, ঢাকার বড় ব্যবসায়ীদের হাতেই ডিমের বাজারের মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোন দামে ডিম বিক্রি হবে, সেই দাম হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেওয়া হয়।

বড় আড়তদার কিংবা করপোরেট খামারগুলো যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের সেই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার ভিত্তিতেই ডিম কেনাবেচা করতে হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ডিম বিক্রেতাদের কেউ কেউ দাম বাড়ার জন্য চাহিদা বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।

তাদের মতে, সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বিকল্প হিসেবে এখন ডিম বেশি কিনছে। ফলে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বেড়েছে।

আবার কয়েকজনের দাবি, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের খামার থেকে ডিমের সরবরাহ কিছুটা কমে গেছে।

তবে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিযোগ ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, ডিমের দাম বাড়ার পেছনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাই মূল কারণ।

তাদের মতে, বাজারে কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

চট্টগ্রামের বাজার নিয়ন্ত্রণেও সিন্ডিকেট

ডিমের বাড়তি দামের প্রভাব শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই। বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ডিমের বাজারে একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও যেখানে এক ডজন ডিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন সেই দাম বেড়ে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় পৌঁছেছে।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদের চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কিছুদিন আগে বৃষ্টির কারণে ডিমের দাম বেড়েছিল।

তবে বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আরও একটি বড় কারণ যুক্ত হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামে ছয় হাজারেরও বেশি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারগুলোর মধ্যে ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার মুরগির খামারও রয়েছে।

এর ফলে চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে ডিমের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বন্যার কারণে তৈরি হওয়া এই সরবরাহ ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন এবং এর সুযোগে ডিমের দাম বাড়িয়েছেন বহুগুণ।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তার বক্তব্য, অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য নিয়ে কারসাজি করছেন। দরিদ্র মানুষের খাবারের তালিকা থেকে ডিমও যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য এ ধরনের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

প্রশাসনের নীরবতা এক রহস্য

ডিমের বাজারে এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডিমের দাম বেড়ে ডজনপ্রতি ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় উঠেছিল। তখন সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খুচরা পর্যায়ে প্রতি ডিমের দাম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা, অর্থাৎ ডজনপ্রতি ১৪২ টাকা নির্ধারণ করে দেয়।

কিন্তু নির্ধারিত দামে বাজার কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর এখন আর সেই মূল্য কেউ মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে যারা বাজারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়িয়েছিল, তারাই নতুন করে সক্রিয় হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের ভূমিকা কী?

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রতিদিন বাজার তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিমের বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে নিয়মিত বাজার তদারকির কথা বলা হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষ কেন পাচ্ছে না—এমন প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

ভোক্তাদের প্রশ্ন, অভিযান ও তদারকি চলার পরও যদি ডিমের দাম নির্ধারিত পর্যায়ে না আসে, তাহলে এর কার্যকারিতা কোথায়? বারবার বাজারের কারসাজির চাপ কেন শেষ পর্যন্ত খেটে খাওয়া মানুষের ওপরই পড়বে?

পুষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ডিম সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মাছ-মাংসের তুলনায় ডিম অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী আমিষের উৎস হিসেবে বিবেচিত।

সেই ডিমের দামও যদি এভাবে বেড়ে যায়, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির ওপর তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই শুধু সাময়িক অভিযান কিংবা জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ডিমের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা জরুরি। বাজারে কোনো অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না, সেটিও কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

নিয়মিত বাজার তদারকি ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ডিমের বাড়তি দামের কারণে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে তৈরি হওয়া সংকট সহজে কাটবে না।

Visited 6 times, 1 visit(s) today