দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের নাভিশ্বাস চরমে, জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ২১০৫ কোটি টাকার বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প!

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের নাভিশ্বাস চরমে, জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ২১০৫ কোটি টাকার বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প!
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস যখন চরমে, তখন সেই জনগণের করের অর্থে ঢাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে কথিত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের নামে ২ হাজার ১০৫ কোটি টাকার ‘বিলাসবহুল’ আবাসন প্রকল্প।

সাধারণ মানুষ যখন চাল-ডাল, তেল-নুনের দাম মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন জনগণের করের অর্থে মিরপুরে ১,৩০০ বর্গফুটের বেশি আয়তনের বিলাসবহুল এসব ফ্ল্যাট নির্মাণকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়’ ও ‘জনগণের সাথে চরম তামাশা’ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজ।

জুলাইর কথিত আন্দোলনে আহত-নিহতদের পরিবারকে পুনর্বাসনে রাজধানীর মিরপুরে আধুনিক আবাসন নির্মাণের প্রকল্পটির কথা জানিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, নির্মাণকাজ শেষ হলে নিহত ও আহত পরিবারগুলোকে এসব ভবনে বিনামূল্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে।

মঞ্জুর বলেন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসহ মিরপুরে ১৫টি আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে এসব ভবনে নিহতের পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের বিনামূল্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে।

পড়ুন: জুলাই খাতে আরেক মহাদুর্নীতি: ৩৬ জুলাই আবাসন প্রকল্পে নির্মাণ-কেনাকাটায় ব্যয় ৪৫ গুণ বেশি!

গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে মিরপুর ৯ ও ১৪ নম্বর সেকশনে ২,৩৬৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাট তৈরিতে সরকারের গড়ে খরচ দেখানো হচ্ছে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ টাকা—যার সম্পূর্ণটাই বহন করতে হচ্ছে সাধারণ করদাতাদের।

জানা গেছে, জুলাইর আহতদের জন্য মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে নির্মাণ করা হচ্ছে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫৬০টি ফ্ল্যাট। এছাড়া, নিহতদের পরিবারের জন্য ৭৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০৪টি ফ্ল্যাট। সবমিলে প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জমিতে ‘৩৬ জুলাই’ নামে এই আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে।

দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ওপর যখন অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হচ্ছে, তখন হাজার হাজার কোটি টাকার এই ‘বিলাসপ্রকল্প’ নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতা ও খেটে খাওয়া মানুষ।

অফিস সেরে কারওয়ান বাজারে মাছ কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী বোরহান কবির তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা রক্ত পানি করা আয়ের ট্যাক্স দিই। আর সেই টাকায় ঢাকায় কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বানানো হচ্ছে। সরকার আগে বাজার নিয়ন্ত্রণ করুক, চাল-ডালের দাম কমাক, মানুষের জীবন বাঁচাক!”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে ২ হাজার কোটির বেশি টাকা খরচ করে একেকটি পরিবারকে ১,৩০০ স্কয়ার ফুটের বড় ফ্ল্যাট দেওয়া এক নজিরবিহীন বৈষম্য তৈরি করছে। এই বিপুল অর্থ ঢাকা শহরের কোনো বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পে না ঢেলে যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হতো, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য টেকসই হতো।

নাগরিক সমাজের সমালোচকদের মতে, ঢাকা শহরে জমি ও নির্মাণসামগ্রীর চড়া দামের সুযোগ নিয়ে এই বিশাল বাজেট তৈরি করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু দলীয় ঠিকাদার ও আমলাদের পকেট ভারী করার উদ্দেশ্যে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চালু হওয়া সার্বিক অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে ধ্বংস করে বর্তমান বিএনপি সরকার সাধারণ মানুষের খাদ্যের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিগত ৭ মাসে লিটারপ্রতি জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণহীন বাজার সিন্ডিকেটের কাছে নতজানু হয়ে থাকা প্রশাসন জনগণের কষ্টের টাকায় এমন অযৌক্তিক ‘মেগা বিলাসিতা’ চালিয়ে নিজেদের পকেট ভরছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে ও চাল-ডালের দাম বাড়ার আগুনে জনগণকে পুড়িয়ে হাজার কোটি টাকার আবাসন ভাগ বাঁটোয়ারার এই চক্রান্ত বর্তমান অবৈধ সরকারের প্রশাসনিক ও নৈতিক দেউলিয়াত্বকেই চূড়ান্তভাবে উন্মোচিত করেছে।

জুলাই খাতে আরেক মহাদুর্নীতি: ৩৬ জুলাই আবাসন প্রকল্পের নামে মহা লুটপাট


প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতির মূল্য প্রকৃত দামের তুলনায় ৩ থেকে ৪৫ গুণ পর্যন্ত বেশি দেখানো হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৯০০ টাকা মূল্যের একটি আরসিসি পিলারের দাম ধরা হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। একইভাবে, ২৫ লাখ টাকার লিফটের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯২ লাখ টাকা, ১২ লাখ টাকার সাবস্টেশনের জন্য ৬৩ লাখ টাকা এবং ৯৫ হাজার টাকার পানির পাম্পের মূল্য ধরা হয়েছে ৪ লাখ টাকা।

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, সীমানা প্রাচীর নির্মাণে ৪৫ গুণ, বেড লিফট ক্রয়ে প্রায় চার গুণ, সাবস্টেশন ও পানির পাম্পে প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ধরনের ব্যয় কাঠামো নিয়ে একনেক সভায় ‘৩৬ জুলাই’ আবাসন প্রকল্পের প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা থাকলেও বিস্তারিত তথ্য মেলেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা ও অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া হলেও ব্যয়ের এই অসঙ্গতির দায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। কেউ দ্রুত বাস্তবায়নের চাপকে দায়ী করলেও, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কীভাবে এসব ব্যয় প্রস্তাব করা হলো—সে প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা মেলেনি।

গত ১৬ই জুন পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এসব ঘাটতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নানা জটিলতা তুলে ধরা হয়। সেখানে ফ্ল্যাটের মালিকানা নির্ধারণ, নিহত ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারী চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে।

সভায় অংশ নেওয়া পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা, বাস্তবায়ন নির্দেশিকা এবং সুবিধাভোগীদের তথ্যভিত্তিক তালিকা থাকা জরুরি। কিন্তু এই প্রকল্পে এসব মৌলিক উপাদানের ঘাটতি রয়েছে।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, ইকোসিস্টেম বিশ্লেষণ, মাস্টারপ্ল্যান এবং বরাদ্দের লিখিত কাঠামো থাকা প্রয়োজন।

অথচ এসব বিষয় সম্পূর্ণ না করেই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

Visited 6 times, 6 visit(s) today