জেনেভা সেমিনারে শেখ হাসিনা: “বাংলাদেশে মৌলিক মানবাধিকার নেই” – প্যারিস টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন

জেনেভা সেমিনারে শেখ হাসিনা: “বাংলাদেশে মৌলিক মানবাধিকার নেই” – প্যারিস টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন
শেয়ার করুন

রাজনৈতিক নিপীড়ন, ইচ্ছামতো আটক, শিক্ষার অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ন্যায্য বিচার নিয়ে উদ্বেগ বক্তাদের – প্যারিস টেলিগ্রাফ

জেনেভা, সুইজারল্যান্ড, ৩ অক্টোবর ২০২৬ |
প্যারিস টেলিগ্রাফের জেনেভা প্রতিনিধি

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেনেভা প্রেস ক্লাবে ২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

“বাংলাদেশে শিক্ষার অধিকার, ইচ্ছামতো আটক, ভুয়া ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড ও সাংবিধানিক সংকট” শীর্ষক এই সেমিনারে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা সাবেক রাজনৈতিক প্রতিনিধি, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও গবেষকরা অংশ নেন। আয়োজক হিসেবে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স এবং তুমুকু ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল ইউনিয়নের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মানবাধিকারকর্মী ও জেনেভা প্রেস ক্লাবের সদস্য রহমান মামুন।

রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে হাসিনার উদ্বেগ

মূল বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁর সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তা বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে পারেনি।

তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, নারী এবং দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হত্যা, ইচ্ছামতো আটক, হুমকি ও মামলার শিকার হয়েছেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় কারাগারে বা পুলিশ হেফাজতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, হাজার হাজার আওয়ামী লীগ সমর্থক হয় কারাবন্দি, নয়তো আত্মগোপনে বাধ্য হয়েছেন।

হাসিনা বলেন, তাঁর দৃষ্টিতে রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যক্তিগত অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। অপরাধের অভিযোগ প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার করা উচিত। শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা বা পেশাগত সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।

সেমিনারের পর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান।

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

বেশ কয়েকজন বক্তা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণ নিয়ে কথা বলেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. হাবিবে মিল্লাত মানবাধিকারকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তাঁরা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের ড. সিগফ্রিড ও. উলফ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের ওপর বিধিনিষেধের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠস্বরের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য পাওলো কাসাকা ২০২৪ সালের আগস্টের পর ঘটনাপ্রবাহকে তাঁর মূল্যায়নে ক্রমশ সীমাবদ্ধ হয়ে আসা রাজনৈতিক পরিবেশের প্রমাণ বলে বর্ণনা করেন। জনজীবন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের উল্লেখ মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে বলে তিনি যে অভিযোগ করেন, সে বিষয়েও উদ্বেগ জানান।

সিডস-আফ্রিকার সভাপতি কার্ল গুস্তাভ বিয়ের্টনেস সমান আচরণ এবং ইচ্ছামতো আটক থেকে সুরক্ষাকে গণতান্ত্রিক শাসন ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হিসেবে গুরুত্ব দেন।

জাপানি মানবাধিকারকর্মী শুনিচি ফুজিকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন, সাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে অভিযোগের কথা বলেন। হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের পেছনের আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

হাসিনার মৃত্যুদণ্ড এখনো আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রেক্ষাপটে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের দমন-পীড়নসংক্রান্ত মামলায় ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে এক অভিযোগে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে, বিশেষ করে হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে বিচার করা এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে। হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, কার্যক্রমটি রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত।

সুইজারল্যান্ডের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা জামাদার নজরুল ইসলাম বক্তাদের কাছে জানতে চান, হাসিনা দেশে ফিরলে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের অবস্থান কেমন হবে।

সেমিনারে উপস্থিত বক্তরা

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কমিউনিটি নেতা, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সুইস কমিউনিটি নেতা শ্যামল খান, মানবাধিকারকর্মী সাজিয়া রহমান, জার্মানিভিত্তিক কমিউনিটি নেতা খান সাবরা, যুক্তরাজ্যভিত্তিক কর্মী আখতার হোসেন ভুঁইয়া মিরন এবং পর্তুগালভিত্তিক কমিউনিটি প্রতিনিধি মহসিন রশিদ ও ফরহাদ খান।

জেনেভার এই সমাবেশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, ২০২৪ সালের সহিংসতার জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক বিতর্কেরই প্রতিফলন।

সূত্র: প্যারিস টেলিগ্রাফ, জেনেভা প্রতিনিধি, ৩ অক্টোবর ২০২৬

 

Visited 9 times, 10 visit(s) today