মৌখিক তিরস্কার অপরাধ নয়, মব সৃষ্টি-প্রশ্রয় দিয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণতা, রিসেট বাটন চেপে সব ধ্বংস করা অপরাধ: হ্যাঁ ইউনূস, আপনি অপরাধী

মৌখিক তিরস্কার অপরাধ নয়, মব সৃষ্টি-প্রশ্রয় দিয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণতা, রিসেট বাটন চেপে সব ধ্বংস করা অপরাধ: হ্যাঁ ইউনূস, আপনি অপরাধী
শেয়ার করুন

❐ সম্পাদকীয়


মৌখিক সমালোচনা সহ্য করার নাম গণতন্ত্র, আর জনতার শক্তি দিয়ে কাউকে স্তব্ধ করে দেওয়া গণতন্ত্রের পরিপন্থী। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব-সহিংসতা, অধিকার হরণ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।

একটি সভ্য সমাজে কোনো ব্যক্তিকে মৌখিকভাবে তিরস্কার করা, তার কাজের সমালোচনা করা কিংবা প্রকাশ্য স্থানে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো—এসবকে শুধু অপছন্দনীয় বা অসম্মানজনক মনে হওয়ার কারণে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও জনপরিচিত ব্যক্তিরাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তাদের সিদ্ধান্ত, বক্তব্য, কর্মকাণ্ড কিংবা রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে। সেই সমালোচনা কখনো কঠোর হতে পারে, কখনো কটু হতে পারে, এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে অপমানজনকও মনে হতে পারে। কিন্তু শুধু তিরস্কারের ভাষা উচ্চকিত কিংবা অপ্রিয় হওয়ার কারণে তাকে অপরাধ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বাক্‌স্বাধীনতা ও প্রতিবাদের অধিকারকে ব্যাপক সুরক্ষা দিয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন রায়ে প্রতিষ্ঠা করেছে যে, জনপরিসরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে কঠোর, অপমানজনক ও ক্ষুব্ধ ভাষাও থাকতে পারে। এমনকি ঘৃণাসূচক বক্তব্যও সাধারণভাবে সাংবিধানিক সুরক্ষা পেতে পারে, যদি তা প্রকৃত সহিংসতার হুমকি কিংবা আইনত নিষিদ্ধ আচরণের পর্যায়ে না পৌঁছায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, হুমকি দেওয়া, সহিংসতা উসকে দেওয়া, কাউকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা, জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়রানি করার অধিকারও বাক্‌স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত।

এখানে মূল পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ:

কাউকে কথার মাধ্যমে তিরস্কার করা এক বিষয়, আর কাউকে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

প্রথমটি অনেক ক্ষেত্রেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ; দ্বিতীয়টি পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে অপরাধ হতে পারে। একজন নাগরিকের মুখের ভাষা কারও পছন্দ না হলেই তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। একইভাবে, জনতার একটি দল কোনো ব্যক্তির বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীত ভূমিকা অপছন্দ করলেই তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার পেয়ে যায় না।

অপরাধের সীমারেখা কোথায়?

কোনো জনপরিচিত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে তিরস্কার করা আর একটি সংঘবদ্ধ জনতা কর্তৃক কাউকে ঘিরে ধরা, মারধর করা, প্রাণনাশ করা কিংবা তার স্বাভাবিক জীবনযাপন বন্ধ করে দেওয়া এক নয়। কাউকে অপমানজনক কথা বলা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হতে পারে; কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় কাউকে হত্যা করা, শারীরিকভাবে আক্রমণ করা, ভয় দেখিয়ে জনপরিসর থেকে বিতাড়িত করা কিংবা তার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো বৈধতা তৈরি হয় না।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার প্রতিকার পাওয়ার পথ হলো আইন, তদন্ত, বিচার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া। কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের; উত্তেজিত জনতার নয়। জনতার রায়কে আইনের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে অপরাধী নির্ধারণের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় প্রমাণ নয়, বরং সংখ্যার জোর, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সংঘবদ্ধ শক্তি।

এ কারণেই মব-সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। আজ কোনো ব্যক্তির বক্তব্য অপছন্দ হওয়ায় তাকে হেনস্তা করা হলে, আগামীকাল অন্য কারও রাজনৈতিক মত, পেশা, বিশ্বাস কিংবা পরিচয়ের কারণে তার ওপর একই আচরণ চালানো হতে পারে। তখন আর কেউ নিশ্চিত থাকতে পারেন না যে আইন তাকে রক্ষা করবে।

জীবন, শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার কোনো জনতার দয়ার বিষয় নয়

বাংলাদেশের সংবিধানও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী আচরণ ও আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে; কারও জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম কিংবা সম্পত্তির ক্ষতিকর কোনো পদক্ষেপ আইন ছাড়া নেওয়া যায় না। ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী ব্যতিক্রম ছাড়া জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা রয়েছে। আর ৩৯ অনুচ্ছেদে যুক্তিসংগত আইনগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে চিন্তা, বিবেক, বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত বিধানগুলো দেখুন।

শিক্ষার প্রশ্নটিও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন ও গণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং নির্ধারিত পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির অংশ। ফলে কোনো শিক্ষার্থীকে রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা কোনো গোষ্ঠীর বিরাগের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ, পড়াশোনা বা স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে জোর করে বঞ্চিত করার ঘটনা ঘটলে তা গভীর অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন তৈরি করে। নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে অবশ্য দায় ও আইনগত পরিণতি নির্ধারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী।

একই নীতি জীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন, যে মতাদর্শে বিশ্বাস করেন কিংবা যে সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করেছেন—এসবের কোনোটিই তাকে মবের হাতে শারীরিক নির্যাতন বা প্রাণহানির বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে না। কেউ অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হতে হবে আইনের মাধ্যমে। আর কেউ অপরাধ না করে থাকলে রাজনৈতিক অপছন্দের কারণে তাকে শাস্তি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কোনো নাগরিকের অধিকার রক্ষার পূর্বশর্ত এই নয় যে তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে হবে।

ড. ইউনূসের আমলে মব-সহিংসতার প্রশ্ন

বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মব-সহিংসতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের World Report 2026-এ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য গোষ্ঠীর মব-সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন

এ ছাড়া ২০২৫ সালে মব-সহিংসতায় প্রাণহানির বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ওই বছর অন্তত ১৯৭ জন মব-আক্রমণে নিহত হন; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮। একই প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে মব-সহিংসতায় অন্তত ২৯৩ জন নিহত হওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনটি পড়ুন।

এই তথ্যগুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি হলো নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কোনো সরকার ক্ষমতায় আসার পর যদি সংঘবদ্ধ জনতার হাতে বিচারবহির্ভূত শাস্তি, সহিংসতা কিংবা অধিকার হরণের ঘটনা ঘটে, তাহলে সেই সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও বজায় রাখতে হবে। কোনো সরকারের আমলে কোনো ঘটনা ঘটেছে—এটি একটি তথ্যগত দাবি; আর সরকার সরাসরি সেই ঘটনা ঘটিয়েছে, নির্দেশ দিয়েছে কিংবা পরিকল্পিতভাবে তার পৃষ্ঠপোষকতা করেছে—এটি আরও নির্দিষ্ট অভিযোগ, যার জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু সরাসরি নির্দেশের প্রমাণ না থাকলেও, মব-সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়মুক্তির সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও রাজনৈতিক জবাবদিহি দাবি করা যায়।

এই প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূসের আমলে সংঘটিত মব-সহিংসতা ও অধিকার হরণের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোনো ব্যক্তির প্রতি অযৌক্তিক বিদ্বেষ নয়; বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের হিসাব চাওয়ার অংশ। যদি কারও জীবন কেড়ে নেওয়া হয়ে থাকে, শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়ে থাকে, কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে স্বাভাবিক জীবন থেকে বিতাড়িত করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে তদন্ত করতে হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা থাকলে তারও জবাবদিহি প্রয়োজন।

সমালোচনার অধিকার সবার, ক্ষমতাবানেরও

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সংঘটিত অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কথা বলার অধিকার যেমন নাগরিকের রয়েছে, তেমনি ড. ইউনূসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অধিকারও নাগরিকের রয়েছে। তাকে কেউ প্রশংসা করবেন, কেউ তার নীতির বিরোধিতা করবেন, কেউ তার ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করবেন—এটাই গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সেই সমালোচনা তার কাছে অপমানজনক মনে হলেও, শুধু সে কারণে সমালোচককে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

একই মানদণ্ড অবশ্যই সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে। ড. ইউনূসকে প্রকাশ্যে তিরস্কার করা হলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ বলা যাবে না; আবার অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ নাগরিককে তিরস্কার করা হলেও সেটি নিজে থেকেই অপরাধ হয়ে যায় না। কিন্তু তিরস্কারের অজুহাতে কাউকে মারধর করা, হত্যা করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জোর করে বহিষ্কার করা, চলাচলে বাধা দেওয়া কিংবা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা ঘটলে সেটিকে আলাদাভাবে আইনের আলোকে বিচার করতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: বাক্‌স্বাধীনতা যেমন সীমাহীন নয়, তেমনি কোনো ব্যক্তির সম্মান রক্ষার অজুহাতও অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অনুমতিপত্র নয়। প্রকৃত হুমকি, সহিংসতায় উসকানি, বেআইনি বাধা কিংবা অন্য কোনো অপরাধের উপাদান থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কেবল কটু কথা, কঠোর সমালোচনা কিংবা অস্বস্তিকর প্রশ্নকে অপরাধ হিসেবে দেখিয়ে প্রতিবাদ দমন করা হলে বাক্‌স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

সভ্যতার পরীক্ষা হয় ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতায়

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং রাষ্ট্রটি কতটা নিরাপদে একজন নাগরিককে ভিন্নমত প্রকাশ করতে দেয়, কতটা নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করে এবং কতটা দৃঢ়ভাবে জনতার বেআইনি শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়—এসব দিয়েও তার সভ্যতার মান নির্ধারিত হয়।

মৌখিক তিরস্কারকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং মবের হাতে জীবন, শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার হরণের ঘটনাকে উপেক্ষা করার প্রবণতা একসঙ্গে চলতে পারে না। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের কথাকে নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী হয়, অথচ নাগরিকের জীবন ও অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে তার অগ্রাধিকারের প্রশ্ন উঠবেই।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব-সহিংসতা ও অধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর যথাযথ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার বা অন্য কোনো জনপরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর মৌখিক সমালোচনাকে শুধু অপছন্দের কারণে অপরাধে পরিণত করার প্রবণতাও প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

কারও কথায় অপমানিত হওয়া আর কারও হাতে জীবন, স্বাধীনতা কিংবা শিক্ষার অধিকার হারানো এক বিষয় নয়। প্রথমটির জবাব হতে পারে যুক্তি, প্রতিবাদ ও পাল্টা বক্তব্য; দ্বিতীয়টির প্রতিকার হতে হবে আইন, বিচার ও জবাবদিহি।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় নয়; বরং প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনাও সহ্য করে তার অধিকার রক্ষা করার নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়। জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়া সভ্যতার পরিচয় নয়। সভ্যতার পরিচয় হলো—যে ব্যক্তি যত অপ্রিয়ই হোন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হবে আইনে; তার জীবন, স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার কোনো মবের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে না।

Visited 11 times, 11 visit(s) today