বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের দ্বার উন্মোচনে মেটা-ফেসবুকের শরণাপন্ন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসন; বাংলাদেশ দ্বার খুলতে যাবে কার কাছে?

বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের দ্বার উন্মোচনে মেটা-ফেসবুকের শরণাপন্ন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসন; বাংলাদেশ দ্বার খুলতে যাবে কার কাছে?
শেয়ার করুন

 

 

“বাণিজ্য চুক্তি”র পরও মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্য ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ কমছে
আর বাংলাদেশে প্রসারিত হচ্ছে মার্কিন পণ্যের বাজার

বিশেষ প্রতিবেদক। ঢাকা, ১৫ অক্টোবর ২০২৬।


বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসন মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, মেটার সঙ্গে “বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর বিষয়ে” তাঁর “প্রাণবন্ত আলোচনা” হয়েছে। একই বার্তায় তিনি লিখেছেন, ফেসবুকের প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসার প্রমাণ চোখের সামনেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধীন সব দূতাবাসের ফেসবুক পেজের মধ্যে ঢাকার দূতাবাসের পেজটিই সবচেয়ে বড়।

 

ঢাকায় আসার আগে ক্রিস্টেনসন বলেছিলেন, নিশ্চিত হলে তিনি মার্কিন ব্যবসার সুযোগ বাড়াতে, বাণিজ্য বাধা কমাতে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কাজ করবেন। জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম সফরে তিনি প্রায় ৬০ হাজার টন মার্কিন গমের জাহাজ আগমনের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব পণ্যের মানের পক্ষে সুপারিশ করেন বলে দূতাবাসের মুখপাত্র জানিয়েছেন। ১৫ সেপ্টেম্বর দূতাবাসের ফেসবুক পোস্টে তিনি বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়ে বলেন, “পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির” অংশ হিসেবে মার্কিন কোম্পানির বাজার প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ নিয়ে কথা হয়েছে।

 

“মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি” স্বাক্ষরের পর এক একে বাংলাদেশের বাজারের সকল দ্বার খুলে যাচ্ছে, খুলতে সাহায্য করছে সরকার, বিডা, মেটা সহ অনেক পক্ষই। কিন্তু মার্কিন বাজারের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া ২৫০০টি পণ্যের ক্ষেত্রে কেন একে একে বন্ধ হচ্ছে দ্বার?

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি পরবর্তী অবস্থাঃ

২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের (১২ ফেব্রুয়ারি) তিন দিন আগে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াশিংটনে “পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি” সই করে। এতে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামে। তবে এ শুল্ক বিদ্যমান ১৫.৫ থেকে ১৬.৫ শতাংশ সাধারণ শুল্কের ওপর বাড়তি হওয়ায় কার্যকর গড় শুল্ক ছিল প্রায় ৩৪ থেকে ৩৪.৫ শতাংশ।

এ বছরের জুলাই মাসে, “বাণিজ্য চুক্তি” স্বাক্ষরের পাঁচ মাসের মাথায় ‘জোরপূর্বক শ্রম” এর কারণে তাদের জন্য বাংলাদেশী পণ্যের উপর ১০% অতিরিক্ত শুল্ক।  ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) কার্যালয় ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ৩০১’-এর আওতায় তদন্ত শেষে এই নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর করে।

বর্তমানে, মার্কিন বাজারের বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫.৬২%।

 

দুই বছরে তিনবার শুল্ক বৃদ্ধি

গত দুই বছরের মধ্যে এটি তৃতীয় শুল্ক ব্যবস্থা, যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় জরুরি অবস্থার আইনের আওতায় পারস্পরিক শুল্ক (reciprocal tariffs) আরোপের আগে, অর্থাৎ

২০২৩-২৪ অর্থবছরতো যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড় শুল্কের হার ছিল ১৫.৬২ (নিট পোশাক), এবং নিট নয় এমন পোশাকের ক্ষেত্রে গড় শুল্কের হার ছিল যথাক্রমে ১৮.৭ শতাংশ ও ১৫.৮ শতাংশ। ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিলে, ১২২ নম্বর ধারার (Section 122) অধীনে ১০ শতাংশ হারে একটি সাময়িক বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর করা হয়। ২৪ জুলাই সেই শুল্কের ১৫০ দিনের আইনি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই তার জায়গায় ৩০১ নম্বর ধারার (Section 301) শুল্ক ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।

 

মার্কিন বাজারে অবস্থান হারাচ্ছে বাংলাদেশ

এই অতিরিক্ত শুল্কারোপের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ তার পূর্বের অবস্থান হারিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত (জানুয়ারি–আগস্ট) প্রকাশিত অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী (OTEXA), যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়ে দ্বিতীয় অবস্থান হারিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। ভিয়েতনাম যথারীতি প্রথম অবস্থানে রয়েছে আর চীন বাংলাদেশ-কে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় উঠেছে।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি–আগস্ট) বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৫.৩৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৪৩ শতাংশ কম। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির প্রিমান ছিলো ৫.৬৪ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে পোশগাক রপ্তানি হয় ২০২৪ এর জানুয়ারি থেকে আগস্ট, এই আট মাস, যার পরিমান ছিলো ৪.৭ বিলিয়ন ডলার।

একই সময়ে চীন রপ্তানি করেছে ৫৬৩ কোটি বা ৫.৬৬ বিলিয়ন ডলার এবং ভিয়েতনাম রপ্তানি করেছে ১০.৯৮ বিলিয়ন ডলার।

 

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ

জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এফ ও জে ভিসাধারীদের থাকার মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছরে সীমিত করার নীতি ঘোষণা করে। এতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছাত্র ভিসার আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পরীক্ষার নিয়মও আছে। জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশিদের ব্যবসা ও পর্যটন ভিসায় ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত বন্ড লাগছে, তবে ছাত্র ভিসা এর বাইরে। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ কমছে।

বিভিন্ন সূত্রে শিক্ষার্থীদের ভিসা রিজেকশনের তথ্য আসছে। বেশীএভাগ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পুরো মেয়াদের ফী জমা না দিলে এখন আর বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো  CAS (Confirmation of Acceptance for Studies) লেটার বা, CoE (Confirmation of Enrolment) লেটার ইস্যু করছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তি নিশ্চয়তা তথ্য এম্বেসীতে দিলেও ভিসা রিজেকশন হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের (DOS) বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ৪ বছরে বাংলাদেশে মার্কিন ভিসা ইস্যুর সংখ্যাঃ

২০২৩ সাল (ইউএস অর্থবছর ২০২৩):

এই সময়কালটি ছিল বাংলাদেশী নাগরিকদের ভিসা পাওয়ার অন্যতম সেরা বছর। এই অর্থবছরে সর্বমোট ৫৯,২৫৪টি ভিসা ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে:

  •  অঅভিবাসী ভিসা (ট্যুরিস্ট, স্টুডেন্ট, বিজনেস ইত্যাদি): ৪৪,৬৭৪টি
  •  অভিবাসী ভিসা (স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য): ১৪,৫৮০টি

২০২৪ সাল (ইউএস অর্থবছর ২০২৪):

২০২৪ সালে (ইউএস অর্থবছর ২০২৪) বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য সর্বমোট ১৩,২১০টি অভিবাসী (Immigrant) ভিসা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

  • অভিবাসী ভিসা (স্থায়ীভাবে বসবাস):  ১৩,২১০টি
  • অঅভিবাসী ভিসা (ট্যুরিস্ট, স্টুডেন্ট, বিজনেস ইত্যাদি): ৩৫,৭৯৩টি ( ৯৫৭টি এফ-১ (স্টুডেন্ট) ভিসা)

২০২৫ সাল (ইউএস অর্থবছর ২০২৫):

এই অর্থবছরে শুধুমাত্র অভিবাসী (Immigrant) ক্যাটাগরিতেই প্রায় ১৮,০০০ বাংলাদেশী নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতি মাসে গড়ে ১,৫০০ থেকে ২,৫০০-এর বেশি অঅভিবাসী বি১/বি২ (ট্যুরিস্ট/বিজনেস) এবং এফ১ (স্টুডেন্ট) ভিসা ইস্যু করা হয়।

 

বিনিময়ে বাংলাদেশকে যা যা দিতে বাধ্য করা হয়েছেঃ

  • মার্কিন ৭,১৩২টি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, যেখানে বাংলাদেশের পণ্য পাবে ২,৫০০টিতে (চুক্তির আগে মার্কিন ৪৪১টি পণ্য শুল্কমুক্ত ছিল)
  • ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি, প্রধানত এলএনজি
  • ১৪টি বোয়িং বিমান (৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ ৩.৭ বিলিয়ন ডলারে চুক্তি করেছে; কিছু প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২৫টির কথা এসেছিল)
  • গম, সয়া, তুলা, ভুট্টাসহ প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য
  • মার্কিন পোল্ট্রি, গরুর মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও বাদামে বাজার সুবিধা
  • মার্কিন যানবাহন ও এফডিএ মান গ্রহণ এবং পুনর্নির্মিত পণ্যের আমদানি অনুমতি

সমালোচকদের হিসাবে ১ শতাংশ পয়েন্ট শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে বাংলাদেশ বাজার খুলে দিয়েছে।  জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত বা বাণিজ্য ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশকে “পরিপূরক সীমাবদ্ধকরণ ব্যবস্থা” নিতে হবে।

পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের ৮ মাসে মুক্ত বাজার ব্যাবস্থায় ৭,১৩২টি মার্কিন পণ্যে আর ২৫০০টি  বাংলাদেশি পণ্যের যেই শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছে, তার মাঝে শুধু ঔষধই বাংলাদেশে একটি বড় রপ্তানি খাত।

কিন্তু এই খাতেও রয়েছে আবার বাধ্যবাধকতা। রপ্তানিকৃত ঔষধটিকে হয় সাধারণ জেনেরিক হতে হবে অথবা মার্কিন সরকারের তালিকাভুক্ত বিশেষায়িত ক্যাটাগরির হতে হবে, এবং অবশ্যই  ইউএস এফডিএ (US FDA)-এর কঠোর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে।  বিশেষায়িত ক্যাটাগরির ঔষধ গুলোর  মধ্যে রয়েছে বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সব ওষুধ, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, সেল থেরাপি, জিন থেরাপি, অ্যান্টিবডি ড্রাগ কনজুগেটস এবং প্রাণীদের ওষুধ, যার খুব কমই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়, যাও বা আবার উৎপাদিত হয়, তাও লাগবে এফডিএ অনুমোদন। তথচ মার্কিন পণ্যে এমন কোন অনুমোদন, ইন্সপেকশন, পারমিশন, ঝুট ঝামেলা নাই, কোন নো, কিন্তু, বা্‌ ইফ নাই।

এই যে অসম চুক্তি আর বাণিজ্য বৈষম্য চাপিয়ে দেয়া হলো বাংলাদেশের উপর, আর যুক্তরাষ্ট্রের অবিরত সুযোগ সৃষ্টি হলো, এটা কিভাবে মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্ক হতে পারে?

 

Visited 3 times, 1 visit(s) today