জনাব চিফ হুইপ কি জানাবেন, ৮ মাসে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করে উৎপাদনে যাওয়ার সায়েন্স কী?

জনাব চিফ হুইপ কি জানাবেন, ৮ মাসে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করে উৎপাদনে যাওয়ার সায়েন্স কী?
শেয়ার করুন

“হাসিনার বিদ্যুৎ প্লান্ট আছে, কিন্তু ভিতরে মেশিন নাই।
হাসিনা টাকা খাওয়ার জন্য এসব বিদ্যুৎ প্লান্ট করেছে। তাই এখন বিল কমানোর কোনো রাস্তা সরকারের কাছে নাই।”

 

বিশেষ প্রতিবেদক। ঢাকা, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬।


জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির ‘আগামী বছর দেশে উৎপন্ন বিদ্যুৎ রাখার মতো অবস্থা থাকবে না’—এমন বক্তব্যের পর বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শুরু হওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চলতি বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে এগোচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র আট মাসের সরকার পরিচালনার সময়ের মধ্যে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা কতটা সম্ভব, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

১৮ অক্টোবর বরগুনার বেতাগী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন,

আগামী বছর দেশে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাখার মতো অবস্থা থাকবে না। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো থাকলেও মূল যন্ত্রাংশ ছিল না এবং অর্থ অনিয়মের উদ্দেশ্যে এসব কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল। এ কারণে বিদ্যুতের বিল কমানোর সুযোগও সীমিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মানুষ কি এখনো ২০০১ সালেই বসবাস করছে বলে মনে করেন চিফ হুইপ?

তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে যেভাবে উদ্ভট ও বাস্তবতাবিবর্জিত তত্ত্ব সামনে আসছে, তা তিনি নিজে বিশ্বাস করলেও বাংলাদেশের মানুষ এখন আর সেই জায়গায় নেই। তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে দেশের মানুষ এখন অনেক বেশি তথ্যসচেতন এবং বিভিন্ন বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সক্ষম। ফলে চিফ হুইপের এমন বক্তব্যগুলো শুধু বিতর্কই তৈরি করছে না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল ও মিম তৈরিরও রসদ জোগাচ্ছে।

 

রূপপুরের অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে সরকার

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের দুটি ইউনিটের মোট পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটির অর্থায়ন ও নির্মাণকাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

প্রকল্পটির সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর ভবনের ভৌত নির্মাণকাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ প্রায় ৯৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল। অর্থাৎ বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে দীর্ঘদিনের নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি রয়েছে।

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করার অনুমোদন দেয়। এরপরও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও দুটি অনুমোদন প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বছরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনার কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, জ্বালানি স্থাপন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ—প্রতিটি ধাপের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কারিগরি প্রস্তুতি প্রয়োজন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে উৎপাদনে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

 

আট মাসে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির বিজ্ঞান কী?

চিফ হুইপ যদি পূর্ববর্তী সরকারের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তবে সেই অভিযোগের পক্ষে প্রকল্পভিত্তিক তথ্য, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি নথি প্রকাশ করাও জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলে কতটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, কতটির উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছে এবং কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাস্তবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে—সেসব তথ্যও জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।

প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সরকার যদি  আট মাসের মধ্যে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করার দাবি করে, তাহলে সেই সক্ষমতা তৈরির প্রকল্পগুলো কোথায়? সেগুলোর অর্থায়ন, জমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং উৎপাদনে যাওয়ার সময়সীমা কী?

আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পূর্ববর্তী সরকারের সময় থেকেই বাস্তবায়নের পথে থাকলে, সেটির উৎপাদন শুরু হওয়ার ঘটনাকে কেবল বর্তমান সরকারের আট মাসের অর্জন হিসেবে দেখানো কতটা তথ্যসম্মত হবে?

 

সুতরাং চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির কাছে প্রশ্ন—মাত্র আট মাসে নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করে উৎপাদনে যাওয়ার বিজ্ঞানটা কী? আর যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তি, অর্থায়ন ও নির্মাণের বড় অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পন্ন হয়েছে, সেই প্রকল্পের উৎপাদন শুরু হলে তার কৃতিত্ব নির্ধারণে কোন তথ্য ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, একজন চীফ হুইপ ও সংসদ সদস্যকে আরও বাস্তসম্মতভাবে কথা বলা উচিত। এমনিতেই সংসদস্যদের উপর মানুষের আস্থা আর নেই, তার উপর চীফ হুইপের এই সকল বক্তব্য এমপ’দের হাস্যাস্পদে পরিণত করছে।

Visited 19 times, 2 visit(s) today