লুটপাট ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কঠোর ম্যাক্রোঁ সরকার;
প্রতিবাদ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, বিক্ষোভকারীদের পাশে শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। ২৪ অক্টোবর, ২০২৬।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সংকট এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের বিক্ষোভ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শনিবার (২৪ অক্টোবর) লিওঁ, পাউ, বোর্দো ও মন্টপেলিয়েসহ বিভিন্ন শহরে তরুণদের সমাবেশের খবর পাওয়া গেছে। লিওঁতে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। অন্যান্য স্থানেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। খবর এএফপি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এরপর নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন বিক্ষোভের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। শনিবারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে আসায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
কঠোর অবস্থানে ম্যাক্রোঁ সরকার
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকারের অবস্থান, জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সহিংসতা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। গত সপ্তাহের সহিংসতার পর ম্যাক্রোঁ প্রশাসন গোয়েন্দা তৎপরতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি পর্যালোচনায় উদ্যোগ নেয়। সরকার অভিযোগ করেছে, উগ্র বামপন্থী কিছু সংগঠিত গোষ্ঠী সহিংসতা উসকে দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনশৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
সরকারি অবস্থানের পক্ষে যুক্তি হলো, বিক্ষোভের নামে দোকানপাট লুট, সরকারি ভবনে হামলা কিংবা অগ্নিসংযোগের সুযোগ দেওয়া যায় না। এসব ঘটনায় সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সমাবেশ সীমিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন।
তবে বিক্ষোভের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নাগরিক অধিকার সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর একাংশের অভিযোগ, জনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তিতে প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করা হলে সরকারের সমালোচনা এবং মানুষের অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
পুলিশের কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন, বিক্ষোভকারীদের পক্ষে নাগরিক অধিকারকর্মীরা
লিওঁতে নিষিদ্ধ এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সড়ক অবরোধের চেষ্টার পর পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। এর আগে গত সপ্তাহের সহিংসতায় কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায়। লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় দোকানপাট, সরকারি স্থাপনা এবং জনসাধারণের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক অংশ। তাদের মতে, সহিংস অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা এক বিষয় নয়। প্রশাসনিক আদালতে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আবেদনও করা হয়েছে; কয়েকটি ক্ষেত্রে আদালত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর একাংশও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সমস্যা এবং জনসেবার অবনতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষকে শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে সংকটের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।
তবে বিক্ষোভকারীদের প্রতি এই সমর্থনকে লুটপাট বা পুলিশের ওপর হামলার সমর্থন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ফ্রান্সের চলমান পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় গোষ্ঠী এবং সহিংসতা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফরাসি জনগণ কি দাঙ্গাকারীদের রক্ষা করছেন?
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা এবং প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার দাবি ফ্রান্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করেছে। নাগরিক অধিকারকর্মী ও শ্রমিক সংগঠনের একাংশ সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে অতিরিক্ত কঠোর বলে মনে করছে। তাদের আশঙ্কা, নির্বিচারে সমাবেশ সীমিত করা হলে সাধারণ প্রতিবাদকারীরাও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন।
চলমান পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় পাশাপাশি রয়েছে: একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ, অন্যদিকে লুটপাট, ভাঙচুর ও সহিংসতার কারণে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
সরকারের কঠোর অবস্থানকে সমর্থনকারীরা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। বিপরীতে, নিষেধাজ্ঞার সমালোচকেরা বলছেন, সহিংসতা দমনের নামে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সংকটের কেন্দ্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবা
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মীর ঘাটতি, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবির মধ্যে উচ্চশিক্ষায় সুযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ের বড় বিক্ষোভগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। তবে বিক্ষোভের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে আয়োজক ও সরকারি হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ওই সমাবেশগুলোর একাংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু এলাকায় সংঘর্ষ ও লুটপাট পরিস্থিতিকে সহিংস করে তোলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ম্যাক্রোঁ সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে—একদিকে জননিরাপত্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করা। কেবল পুলিশ মোতায়েন বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফ্রান্সের চলমান ঘটনাপ্রবাহ আবারও দেখাচ্ছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিবাদের অধিকার ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সহিংস অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের কারণগুলো মোকাবিলা করা না গেলে সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন হতে পারে।
