চড়া দামে ১৫ বছরের চুক্তি সত্ত্বেও ৭ মাস ধরে এলএনজি দিচ্ছে না পিটার হাসের কোম্পানি

চড়া দামে ১৫ বছরের চুক্তি সত্ত্বেও ৭ মাস ধরে এলএনজি দিচ্ছে না পিটার হাসের কোম্পানি
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি। মার্চের শুরু থেকে সরবরাহ স্থগিত রাখা কোম্পানিটি সর্বশেষ এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এতে দেশের চলমান গ্যাসসংকট মোকাবিলায় এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ আরও চাপে পড়েছে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “এক্সিলারেট এনার্জি মার্চের শুরুতে ফোর্স মেজর ঘোষণা করে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর কয়েক দফায় এর মেয়াদ বাড়িয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি, যার সর্বশেষ সময়সীমা নভেম্বর পর্যন্ত।”

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের জন্য পেট্রোবাংলার সঙ্গে এক্সিলারেট এনার্জির দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয় ও ক্রয় চুক্তি (এসপিএ) রয়েছে। বাজার দরের চেয়ে উচ্চমূল্যের এই চুক্তি নিয়ে দেশের মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে।

দুই পক্ষের মধ্যে ২০২৩ সালের ৮ই নভেম্বর চুক্তিটি সই হয়। এর আওতায় ২০২৬ সাল থেকে ১৫ বছর বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করার কথা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের অধীনস্ত কোম্পানিটির।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ ও ২০২৭ সালে প্রতি বছর ১২টি করে এলএনজি কার্গো সরবরাহ করার কথা। ২০২৮ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত বছরে সরবরাহের পরিমাণ হবে ১৬টি কার্গো।

চুক্তিতে এলএনজির দাম হিসাবের পদ্ধতিও নির্ধারণ করা আছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের তিন মাসের গড় দামের ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশের সঙ্গে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) জন্য ০.৩০ ডলার নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম যোগ করে দাম নির্ধারণ করার কথা।

দেশের কূপগুলো থেকে গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। গত ছয় বছরে জাতীয় গ্রিডে দেশীয় কূপের গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৩৪ শতাংশ কমেছে। ঘাটতি মেটাতে একই সময়ে আমদানিকৃত এলএনজির সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।

এখন জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা মোট গ্যাসের প্রায় ৩৮ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট গ্যাস সরবরাহে এলএনজির অংশ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়তে এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্যেও দেশীয় উৎপাদন কমা এবং এলএনজির সরবরাহ বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২০ সালের ১লা অক্টোবর দেশীয় কূপ থেকে দৈনিক ২ হাজার ৪৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছিল। চলতি বছরের ১লা অক্টোবর তা কমে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়।

বিপরীতে, এ সময়ে এলএনজি সরবরাহ দৈনিক ৭০২ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে। ছয় বছরে এই সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে, একই সঙ্গে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও ভারী হচ্ছে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব পড়েছে এলএনজি আমদানির ব্যয়েও। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। একই সময়ে এলএনজিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা যাচ্ছিল। সেপ্টেম্বরে দাম বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছায়—কয়েক মাসের ব্যবধানে তা প্রায় তিন গুণ হয়।

কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। পুরো বছরের জন্য এ খাতে বরাদ্দ ছিল সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।

এ ছাড়া গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরেও পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হওয়ায় দেশের রিজার্ভে চাপ পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখতে সরকারকেও বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে এই চাপ আরও তীব্র হয়।

দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা এখন দৈনিক ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। গত সোমবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ৯৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ সেদিন মোট সরবরাহের প্রায় ৩৮ শতাংশ ছিল আমদানিকৃত গ্যাস।

এলএনজি আমদানিতে বিপুল ব্যয় এবং হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও দেশে প্রতিদিন দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে জ্বালানিসংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে ২০৩০ সালের মধ্যে এলএনজির ওপর নির্ভরতা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমদানির এই বিপুল ব্যয় সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে এলএনজি প্রয়োজন হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি জ্বালানিসংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত জোরদার, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানো এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন না বাড়লে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির ব্যয় আরও বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাওয়া, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। তখন দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে আমদানিকে পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই এলএনজি জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। দেশীয় উৎপাদন কমতে থাকায় প্রতি বছর এলএনজি আমদানি বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও।

Visited 3 times, 1 visit(s) today