❐ জেলা প্রতিনিধি
বরগুনার ডাকবাংলোর দুটি পৃথক কক্ষ থেকে মা ও তার দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত শেষে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, বিভিন্ন এনজিও ও ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া ৪ লাখ টাকার বেশি ঋণ নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন ইতি রানী। হতাশা থেকে তিনি ১২ বছর বয়সী মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস ও ৩ বছর বয়সী অনুরাধা বিশ্বাসকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার, ২৯শে অক্টোবর, বিকেলে বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খাঁন।
পুলিশ জানায়, প্রায় ১৫ বছর আগে বরগুনা পৌরসভার কড়ইতলা এলাকার বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে ইতি রানীর বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দুই মেয়ে ছিল। দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস একটি ছোট দর্জির দোকান চালানোর পাশাপাশি সুপারির ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। তবে এসব ব্যবসা থেকে তার আয় সীমিত হওয়ায় পরিবারের অভাব-অনটন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সংসারের অবস্থা সামলাতে এবং স্বামীর ব্যবসায় উন্নতির আশায় ইতি রানী স্থানীয় পাঁচটি এনজিও থেকে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেন। পাশাপাশি দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং দুই ব্যক্তির কাছ থেকে আরও ১ লাখ টাকা ধার করেন।
পুলিশি হিসাব অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর নামে নেওয়া ঋণের মোট পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা।
ইতি রানী বেশির ভাগ এনজিওর ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করলেও পুরো ঋণ শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। সংসারের আয় বাড়াতে তিনি জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ নেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের চাপে হতাশ হয়ে ইতি রানী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ঘটনার প্রায় দুই মাস আগে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন ইতি রানী। গত ৩রা জুন সকাল ১১টার দিকে তিনি দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানে যান।
সেদিন দুপুরের দিকে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পেয়ে অন্য কর্মীরা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে একটি কক্ষ থেকে বড় মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাসের মরদেহ এবং তালাবদ্ধ কক্ষের ভেতর থেকে ইতি রানী ও ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করে।
মা ও দুই মেয়ের মরদেহ একসঙ্গে উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। ঘটনাটি হত্যা, নাকি আত্মহত্যা—তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
এরপর ৯ই জুন ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে বরগুনা থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ইতি রানী ও তার স্বামী বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তির কাছে ঋণগ্রস্ত ছিলেন।
এই ঋণজনিত মানসিক চাপ ও হতাশার কারণেই ইতি রানী দুই মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খাঁন বলেন, ইতি রানীর স্বামীর কোনো জমি ছিল না, তাদের পুত্রসন্তানও ছিল না। স্বামীর আর্থিক সচ্ছলতার অভাব এবং বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের চাপ ইতি রানীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণেই ইতি রানী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে।
পুলিশ সুপার জানান, খুব শিগগিরই আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
