সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে তৌহিদ হৃদয়ের এক অবিশ্বাস্য অপরাজিত দ্বিশতকে স্বাগতিক বাংলাদেশ অপ্রত্যাশিত লিড পেয়েছে। ডানহাতি এই ব্যাটারের এমন রেকর্ড গড়া ইনিংস দেখে প্রশংসায় ভেসেছেন বাংলাদেশ দলের হেড কোচ ফিল সিমন্স।
হৃদয়ের অপরাজিত ২৪২ রানের ইনিংসটি টেস্ট ক্রিকেটে যেকোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। বিপর্যয় থেকে দলকে টেনে তুলে তিনি ম্যাচের দৃশ্যপট একাই বদলে দেন।
তৃতীয় দিনের খেলা শেষে সাংবাদিকদের সিমন্স বলেন, ‘ইনিংসটি সবদিক দিয়েই অসাধারণ ছিল। সবশেষে বলতে হয়, সত্যিই এটি অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। বাউন্ডারিতে ফিল্ডার থাকার পরও তিনি চার-ছক্কা হাঁকাতে পেরেছেন। এমনকি দ্বিশতকের কাছাকাছি গিয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখনও তার চেষ্টা ও নিবেদন ছিল অসাধারণ।’
বাংলাদেশের মোট রানের ৬২.৬৯ শতাংশই এসেছে হৃদয়ের ব্যাট থেকে। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে মাত্র সাতটি ইনিংসে কোনো ব্যাটার দলের মোট রানে এরচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পেরেছেন, যেখানে সর্বকালের সেরা রেকর্ডটি অস্ট্রেলিয়ার চার্লস ব্যানারম্যানের (৬৭.৩৪ শতাংশ)।
প্রথম দিনে ফিল্ডিংয়ের সময় গোড়ালিতে চোট পেয়ে ছিটকে যান ওপেনার শাদমান ইসলাম। এরপর ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে চরম বিপদে পড়েছিল বাংলাদেশ। তখন মনে হচ্ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সহজেই বড় লিড পেয়ে যাবে। কিন্তু হৃদয় ছিলেন অন্য ভাবনায়। ৩৫৯ বলে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় ২৪২ রানে অপরাজিত থাকেন এই ডানহাতি ব্যাটার। শেষ দিকে তাকে দারুণ সঙ্গ দেন তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদ।
অষ্টম ও নবম উইকেটে তাইজুল ও তাসকিনকে সঙ্গে নিয়ে যথাক্রমে ১১৭ ও ৮৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন হৃদয়। তাইজুল ২২ এবং তাসকিন ১২ রান করেন। তাদের এই লড়াকু মনোভাবের ওপর ভর করে বাংলাদেশ তুলে নেয় ৩৮৬ রান, পেয়ে যায় অপ্রত্যাশিত ৩০ রানের লিড।
টেইলএন্ডারদের (নিচের সারির ব্যাটার) সঙ্গে নিয়ে ব্যাটিং করা এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝার জন্য তরুণ এই ব্যাটারের বাড়তি প্রশংসা করেন সিমন্স। তিনি তুলে ধরেন কীভাবে হৃদয় নিজের রান তোলার পাশাপাশি লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের খেলার সুযোগ করে দিয়েছেন।
সিমন্স বলেন, ‘গেম সেন্স বা খেলা বোঝা, সঠিক শট বেছে নেওয়া আর শেষের তিন ব্যাটারকে কখন স্ট্রাইক দিতে হবে—সবকিছুই এই ইনিংসে সে নিখুঁতভাবে করেছে।’
ঢাকা টেস্টের উভয় ইনিংসে বাজে শট খেলে আউট হওয়ায় হৃদয়ের শট সিলেকশন ও দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি মুমিনুল হক কনকাশন প্রোটোকলে ছিটকে না পড়লে সিলেটে তার একাদশে থাকাই অনিশ্চিত ছিল। তবে সেই সমালোচনার জবাব তিনি দিলেন ব্যাটে বসেই।
হৃদয়ের এই অসাধারণ ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি এবং কৌশলের পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাইলে সিমন্স বলেন, এই পরিবর্তনের গোপন রহস্য হৃদয় নিজেই ভালো বলতে পারবেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই তরুণের দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার প্রশংসা করেন তিনি।
সিমন্স বলেন, ‘হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে আপনারাই তার কাছে এই পরিবর্তনের গোপন কারণ জানতে চাইবেন। তবে সে কিন্তু শুরু থেকেই ভালো ব্যাটিং করছে। হ্যাঁ, ঢাকায় কয়েকটি ভুল শট খেলেছিল, তবে ওটা তো তার মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট ছিল। তাই সেটা নিয়ে তাকে বিচার করা ঠিক হবে না। সে দ্রুত শিখছে এবং পরিপক্ব হয়ে উঠছে, যা আজ মাঠে দেখা গেল।’
হৃদয়ের সঙ্গে উইকেটে টিকে থাকার জন্য তাইজুল ও তাসকিনের প্রশংসা করতেও ভুলেননি কোচ। তিনি জানান, অনুশীলনে যা নিয়ে কাজ করা হচ্ছিল, মাঠে ঠিক সেটাই দেখা গেছে।
সিমন্স আরও যোগ করেন, ‘আমাদের বোলারদের কাছ থেকে আমরা এটাই চেয়েছিলাম—উইকেটে কোনো ব্যাটার সেট থাকলে তার সঙ্গে টিকে থাকতে হবে, লড়াই করতে হবে। বোলাররা ঠিক সেটাই করেছে। দুর্ভাগ্যবশত হাসান মাহমুদ রান পায়নি, তবে বোলাররা যেন প্রধান ব্যাটারদের সঠিক সঙ্গ দিতে পারে, অনুশীলনে আমরা সবসময় এটাই নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’
