সংবাদ প্রতিবেদন
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। যত্রতত্র রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ, সমাবেশ, দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি, মানববন্ধন হচ্ছে। ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। আদালতের ভেতরে বিচারককে ডিম ছুড়ে মারার ঘটনাও ঘটছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী-শিশু নির্যাতন বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে খুনের ঘটনা। তুচ্ছ অজুহাতে ‘মব কিলিং’ বা গণপিটুনিতে মানুষ মারার ঘটনা এখন যেন স্বাভাবিক ঘটনা।
গত ৩ মাসে গণপিটুনিতে খুন হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন। রাতে রাজধানীর রাস্তায় রাস্তায় দেশীয় অস্ত্রসহ হাতে মহড়া দিতে দেখা যায় বিভিন্ন গ্রুপকে। স্থানীয়রা তাদের শিক্ষার্থী, সমন্বয়ক বা জুলাইয়ের সরকারবিরোধী আন্দোলনকারী হিসেবে চেনে। এদের বিরুদ্ধে কেউ আওয়াজ করতে পারেনা। মুহূর্তেই সদলবলে চড়াও হয় তারা। এতে জনমনে বিরাজ করছে আতঙ্ক। এমনকি অনেক ঘটনায় মামলাও করতে ভয় পান মানুষ।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, দুই মাসে (সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর) সারা দেশের থানাগুলোয় মামলা হয়েছে ২৫ হাজার ৪৫৬টি। এর মধ্যে খুনের মামলা কয়েক হাজার। খুনের ঘটনা ঘটেছে ৫২২টি (রোহিঙ্গা ক্যাম্পের তথ্য ছাড়া)। ডাকাতির ঘটনায় মামলা ১১১টি, দস্যুবৃত্তির ২৩১, দ্রুত বিচার আইনে ২২১, দাঙ্গার ২৪, ধর্ষণের ৭৭৪, নারী নির্যাতনের ১ হাজার ৮৩৩, শিশু নির্যাতনের ৫২৯, অপহরণের ১৬১, পুলিশ ওপর হামলার ৫৮, সিঁধেল চুরির ৪৮১ এবং চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৩২৮টি। এছাড়া অন্যান্য মামলা ১৩ হজার ২১১টি। এসময় অস্ত্র আইনে ২৭০, বিস্ফোরক আইনে ২১৪, মাদকসংক্রান্ত ৫ হাজার ৯৯ এবং চোরাচালানসংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩৮টি।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের তুলনায় এ বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে ৬৮টি। এছাড়া ১৯টি দস্যুতা, ৩৪টি খুন, দ্রুত বিচার আইনের ৫৭টি, দাঙ্গা ১১টি, শিশু নির্যাতন ৫৬টি, অপহরণ ৬৩টি, অস্ত্রসংক্রান্ত ৯টি এবং সিঁধেল চুরির ঘটনা বেড়েছে ২৭টি। যার ফলে বোঝা যাচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর একইসময়ে অপরাধপ্রবণতার হার বেড়েছে অনেক বেশি।
প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর কোথাও না কোথাও খুন-খারাবি হচ্ছে। ১৬ই নভেম্বর খুন, ডাকাতি ও ৮ মাসের শিশু অপহরণের মতো চাঞ্চল্যকর তিনটি ঘটনা ঘটে। একইদিন পশ্চিম ধানমন্ডি এলাকায় বাসায় ঢুকে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক চিকিৎসককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আজিমপুরে এক বাসা থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের পাশাপাশি গৃহকর্তার ছোট্ট শিশুকেও তুলে নিয়ে যায় ডাকাতরা। ২০শে নভেম্বর হাজারীবাগে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় যুবদল নেতা জিয়াউর রহমান জিয়াকে।
এর আগের দিন সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে শাহজাহানপুরে খুন হন ইসমাইল হোসেন রাহাত নামের এক শিক্ষার্থী। ২৮শে অক্টোবর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে নিহত হয় ১৩ বছর বয়সি এক কিশোর। আগের দিন রামপুরায় খুন হন এক রিকশাচালক। ২১শে অক্টোবর তেজগাঁওয়ে ছুরিকাঘাতে খুন হন ইমরান হোসেন নামের এক যুবক। ২০শে অক্টোবর রামপুরার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মনি কিশোরের লাশ। ১১ই অক্টোবর মোহাম্মদপুরে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় রবিউল ইসলাম নামের এক নৈশপ্রহরীকে।
ফ্ল্যাট নিয়ে বিরোধের জেরে ১০ই অক্টোবর পিটিয়ে হত্যা করা হয় তামিম নামের এক যুবককে। ৭ই অক্টোবর যাত্রাবাড়ীতে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তিকে। আগের দিন উত্তরায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান সোহান হোসেন সোহাগ নামের যুবক। ৩০শে অক্টোবর যাত্রাবাড়ীতে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় রাসেল শিকদার নামের এক কাঁচামাল ব্যবসায়ীকে। ২৮শে সেপ্টেম্বর গুলশানে এক দোকান মালিক ও তার কর্মচারীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২৪শে সেপ্টেম্বর বনানীতে ছোট ভাইয়ের হাতে খুন হন বড় ভাই।
২১শে সেপ্টেম্বর ছিনতাইকারীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন রিকশাচালক জিন্নাহ মন্ডল। এর আগের দিন মোহাম্মদপুরে নাসির বিশ্বাস নামের একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় আহত হন আরও একজন। ওইদিন আফতাবনগরের ঝোপ থেকে উদ্ধার করা হয় বাংলাদেশ মহিলা সমিতির এক প্রশিক্ষকের লাশ। ১৭ই সেপ্টেম্বর বাড্ডায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় গৃহবধূ বিথী আক্তারকে। ১৪ই সেপ্টেম্বর মুগদায় তুচ্ছ ঘটনায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় শাকিল নামের এক যুবককে।
গত মঙ্গলবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে দুই সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিন চট্টগ্রামে খুন হন সাইফুল ইসলাম আলিফ নামে এক আইনজীবী। পাবনায় দেড় মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৭টি। এ হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ১৭ই নভেম্বর তুষার হোসেন (১৬) নামের কিশোরকে কুপিয়ে খুন এবং ১৮ই নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে ওয়ালিফ হোসেন মানিক (৩৫) নামের এক যুবলীগ কর্মীকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা দুটি ছিল খুবই চাঞ্চল্যকর।
২৫শে নভেম্বর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে সিলেটে নিজ দলের প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন বিলাল আহমদ মুন্সী (৩৫) নামের এক যুবদল কর্মী। ৩১শে অক্টোবর সুনামগঞ্জে বসতঘরের ভেতর মা ও ছেলেকে হত্যার ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় বাড়ির ডিপ ফ্রিজ থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। নভেম্বরের দুই সপ্তাহে রূপগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ও ঝিনাইদহে চালককে হত্যা করে ইজিবাইক ছিনতাই করা হয়। ১০ই নভেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সানারপাড় বাসস্ট্যান্ডে এক পুলিশ সদস্যকে ‘ভুয়া পুলিশ’ আখ্যা দিয়ে গণপিটুনি দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, অপরাধ কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। অপরাধের মাত্রা যাতে কমিয়ে আনা যায় এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সেজন্য পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে।
