‘রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রে’ চিন্ময় কৃষ্ণের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, জানালেন আইনজীবী

‘রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রে’ চিন্ময় কৃষ্ণের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, জানালেন আইনজীবী
শেয়ার করুন
প্রতিবেদন

বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন শুনানিতে মামলা, হামলা ও প্রাণনাশের হুমকিতে কোনো আইনজীবীকে তার পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। কোনো আইনজীবী তার পক্ষে ওকালতনামা দাখিল করলে গণপিটুনি দেওয়া হবে বলে আদালত প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে হুমকি দিয়েছেন আইনজীবী সমিতির কর্তাব্যক্তিরা।

সেইসাথে হিন্দু আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ রহিত করা হয়েছে। চিন্ময় কৃষ্ণের আইনি সহায়তা পাওয়ার মানবাধিকার এভাবে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করলেন সম্মিলিত সনাতনী জোটের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি আইনজীবী সুমন কুমার রায়।

প্রতিটি নাগরিকেরই আইনি সহায়তা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু চিন্ময় কৃষ্ণের ক্ষেত্রে তা লংঘিত হচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মীরা।

চিন্ময় কৃষ্ণের গ্রেপ্তার ও আইনি অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল বলেছেন, যারা অপরাধে অভিযুক্ত তাদেরও উপযুক্ত আইনি সুযোগ দিতে হবে এবং মৌলিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, কোনো আসামির পক্ষে আইনজীবীকে লড়তে না দিলে তার আইনি অধিকার বিঘ্নিত হয়।

গত ২৬শে নভেম্বর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিনকে ঘিরে সহিংসতায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম নিহতের পর করা এক মামলায় ৭০ জন হিন্দু আইনজীবীকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় তার জামিন আবেদনকারী আইনজীবীকেও আসামি করা হয়েছে। এছাড়া তার পক্ষে আদালতে শুনানি করতে পারেন এমন হিন্দু জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরাও এসব মামলার আসামি।

পড়ুন: চিন্ময় প্রভুর মুক্তির দাবী করা জনতার ওপর চলছে সশস্ত্র হামলা (ভিডিও)

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে আইনজীবী সাইফুল হত্যা মামলা এবং এ সংক্রান্ত কোনো মামলায় যেন কোনো আইনজীবী অংশ না নেন সে বিষয়ে ‘নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করা হয়েছে। ফলে এসব মামলায় অন্য আসামিদের জামিনের পক্ষে যেসব আইনজীবী ওকালতনামা দিতে যাচ্ছেন তারাই প্রতিরোধ ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন।

গণধোলাই দেওয়ার হুমকি:

যদিও আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিনের দাবি, কোনো আইনজীবীর ওপর হুমকি বা নিরাপত্তাজনিত কোনো সংশয় ছিল না এবং নাই।

অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে আদালত প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে যেন কোনো আইনজীবী ওকালতনামা দিতে না আসেন, সেজন্য হুমকি দেওয়া হযেছে প্রকাশ্যে। এমনকি গণপিটুনি দেওয়ার কথা বলেও শাসান তারা।

পড়ুন: আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় ৭০ জন সনাতনী আইনজীবীর নাম

আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিনের দাবি মেনে নিলে প্রশ্ন ওঠে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে আদালতে আইনজীবীরা দাঁড়াননি কেন?

গত ২৬শে নভেম্বর চট্টগ্রামের সিএমএম কোর্ট চিন্ময় কৃষ্ণের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিলে ওইদিনই তার আইনজীবীরা এ আদেশের বিরুদ্ধে মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবেদন করে জামিন চান। কিন্তু সেদিন শুনানি হয়নি। ৩রা ডিসেম্বর শুনানির দিন ঠিক করা হয়। ওইদিন আইনজীবী সাইফুল নিহতের ঘটনায় পরবর্তী দুই দিন কর্মবিরতি পালন করে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতি।

প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে চিন্ময় কৃষ্ণকে সব মামলায় আসামি করার দাবি তোলা হয়। এরপরই আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে আসামিপক্ষে আইনজীবীদের না দাঁড়াতে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। কেউ ওকালতনামা দাখিল করলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

চিন্ময় কৃষ্ণের আইনজীবীদের গণধোলাইয়ের হুমকি দিয়ে আইনজীবী সমিতির নেতাদের বিক্ষোভ সমাবেশ

১লা ডিসেম্বর চট্টগ্রাম আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে জানা যায় চিন্ময় কৃষ্ণের জামিন শুনানির দিন ৩রা ডিসেম্বর। কিন্তু রোববার পুলিশের কাজে বাধাদানের অভিযোগে করা মামলায় এক আসামি মুফতি আহমদ হোসাইনের আইনজীবী কাজী মফিজুর রহমান ওকালতনামা জমা দিতে গেলে জোরপূর্বক তা প্রত্যাহার করানো হয়।

গণমাধ্যমে এ বিষয়ে তিনি বলেন,

জামিন চাওয়া যদি অপরাধ হয়, তাহলে আমি জামিন চাইবো না, প্রত্যাহার করে নিব। ওকালতনামা দেয়া আমার সাংবিধানিক অধিকার। বাংলাদেশের বার কাউন্সিলের রুলসে আছে। অথচ সকালে ফেসবুকে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে যে, আমি সাইফুল হত্যা মামলার মধ্যে ওকালতনামা দিয়েছি।

মফিজুর রহমান জানান, নিহত আইনজীবী তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই। একটি স্বার্থান্বেষী মহল এ নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। কারণ যে মামলায় আসামির পক্ষে তিনি আইনজীবী হতে গিয়েছেন সেটি পুলিশের করা মামলা। সাইফুল হত্যা মামলা পৃথক আরেকটি মামলা। অথচ ভুল বার্তা ছড়িয়ে ওকালতনামা প্রত্যাহার করানো হয়েছে।

তিনি বলেন,

যেহেতু পুলিশের ওই মামলায় অজ্ঞাত ২ হাজার ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় একজন সিনিয়র আইনজীবী কাইয়ুম জেল খাটছেন ১০ দিন। তাহলে আমি, আপনি কেউ তো এখানে নিরাপদ না। এগুলা-তো সাইফুল হত্যা মামলা না।

মফিজুর রহমান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তিনি জানান, আইনজীবী সাইফুল হত্যা মামলায় সবাই হিন্দু আসামি। এখানে কোনো মুসলিম নেই।

২৬শে নভেম্বরের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে, তাতে আসামিদের পক্ষে না দাঁড়াতে হুমকি দেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই আইনজীবী বলেন, অবশ্যই, অবশ্যই। না হলে বার কাউন্সিলের রুলস এন্ড অর্ডারের আওতায় একজন আইনজীবী একজন আসামির পক্ষে ওকালতনামা দেবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। অথচ এখানে আমিই নিরাপদ না, আমার স্ত্রী, আমার বউ, আমার বাচ্চা নিরাপদ না।

গত ২রা ডিসেম্বরও একই ঘটনা ঘটেছে।

পড়ুন: চিন্ময় কৃষ্ণের গ্রেপ্তার ও হিন্দু নির্যাতনে উত্তাল ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যম

এদিন পুলিশের ওপর হামলার মামলায় দু’জন আসামি দেলোয়ার হোসেন এবং মো. নুরুর পক্ষে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর নেজাম উদ্দিনের নামে আদালতে ওকালতনামা জমা দেয়া হয়। পরে আইনজীবীদের বিক্ষোভ ও হুমকির মুখে ওকালতনামা প্রত্যাহার করা হয়। মঙ্গলবার চিন্ময় কৃষ্ণের জামিন আবেদনের শুনানির আগেও আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেন এই আইনজীবীরা। সেই সাথে এসব হামলা, ভাঙচুর ও হত্যা মামলার কোনটিতেই চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে আসামি না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা।

মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের শতাধিক আইনজীবী এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। যাদের মধ্যে ছিলেন আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দসহ অনেক সিনিয়র আইনজীবীও। পরে দেখা যায় জামিন আবেদন শুনানির জন্য আদালতে চিন্ময় কৃষ্ণের পক্ষে কোনো আইনজীবী নেই। সময় আবেদনও করেননি তার পক্ষের কোনো আইনজীবী।

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মফিজুল হক সময় আবেদন করেন। চিন্ময় কৃষ্ণের পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় পরবর্তী শুনানি ২রা জানুয়ারি হবে বলে নির্ধারণ করে আদালত।

মফিজুল হক বলেন, আসামিপক্ষে কেউ রেসপন্স না করায় আমি টাইম পিটিশনের কথা বলেছি, এটা গুরুত্বপূর্ণ আর সেনসিটিভ মামলা। পরে আদালত একটা তারিখ দিলেন। দরখাস্ত পেন্ডিং আছে। নামঞ্জুর করেনি আদালত। ওইদিন ওনারা আসলে শুনানি হবে।

পড়ুন: চিন্ময় কৃষ্ণ দাশকে গ্রেপ্তারে আওয়ামী লীগের নিন্দা ও প্রতিবাদ

আসামিপক্ষে মামলা লড়তে চাওয়া আইনজীবীদের বাধা ও হুমকি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিন স্বীকার করলেন পরোক্ষভাবে।

তিনি বলেন,

সমিতির পক্ষ থেকে আমরা আসলে অনুরোধ করেছি আইনজীবী সাইফুল হত্যাকাণ্ড ও এ সংক্রান্ত অন্য মামলায় যেন কোনো আইনজীবী আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ান। বিশেষ করে হত্যা মামলাতে অংশ না নিতে আমরা বেশি বলছি।

চিন্ময় কৃষ্ণের আইনজীবীদের নিরাপত্তাহীনতার কথাটি উল্লেখ করায় নাজিম উদ্দিন এবং মফিজুল হক দুজনই তা অস্বীকার করেন। তবে এ ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে আইনজীবী না থাকলে মামলাটি শুধুমাত্র নথি-জাত করে রাখা হয়।

আইনজীবীরা কেন চিন্ময় কৃষ্ণের পক্ষে দাঁড়াতে পারছেন না? ব্যাখ্যা দিল সনাতনী জোট

কেন আইনজীবীরা চিন্ময় কৃষ্ণের মামলা লড়তে আদালতে যাননি, এর কারণ সম্পর্কে সম্মিলিত সনাতনী জোটের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি আইনজীবী সুমন কুমার রায় বলেন,

আইনজীবী ছিলেন না তা কিন্তু নয়, কোনো আইনজীবীকে আদালতে দাঁড়াতেই দেয়া হয় নাই। সেখানে প্রতিরোধের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। গত দু’দিন বিভিন্ন মামলায় আসামিদের পক্ষে আদালতে শুনানি করতে গেলে বাধার মুখে পড়েন আইনজীবীরা। যারা মামলা লড়বে তাদের গণপিটুনি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। হুমকি নিয়ে আইনজীবীরা কীভাবে দাঁড়াবে আদালতে? এর আগে হিন্দু আইনজীবীদের চেম্বারও ভাঙচুর করা হয়েছে। সব মিলে এমন একটা ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে, কোন আইনজীবী সেখানে দাঁড়াতে পারেনি। পরিস্থিতি শান্ত হলে জামিন শুনানি এগিয়ে আনতে আদালতকে অনুরোধ করব। নামঞ্জুর হলে মামলা প্রত্যাহারের পিটিশন দিব। মামলা প্রত্যাহার হলে নিম্ন আদালতে শুনানির উদ্যোগ নেয়া হবে। যদি সেখানেও নামঞ্জুর হলে হাইকোর্টে আবেদন করা হবে।

এভাবে আইনি সহায়তা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করাকে ‘রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র’ উল্লেখ করে সুমন কুমার রায় বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবেই এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে যেন চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু ন্যায়বিচার না পান, তাকে যেন জেলে রেখে আমাদের ৮ দফা দাবি ভূলুণ্ঠিত করা যায়। তাই একমাসের সময় দেয়া হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার পাই নাই।

মঙ্গলবার কোনো হামলার ঘটনা না ঘটলেও এর আগে রিগ্যান আচার্য নামে একজন হিন্দু আইনজীবীর ওপর শারীরিকভাবে হামলা ও তার চেম্বার ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানান সুমন কুমার। রিগ্যানের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আইনজীবী রিগ্যান আচার্যের চেম্বার ভাঙচুর

সম্মিলিত সনাতনী জোটের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক মানুষের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। বিবিৃতিতে জোটের পক্ষ থেকে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ জানানো হয়।

চট্টগ্রামের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে গণমামলা, হিন্দুরাই মূলত লক্ষ্যবস্তু

ইতিমধ্যে আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীদের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে ১১৬ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামিদের মধ্যে ৭০ জন হিন্দু আইনজীবী ছাড়াও দুজন সাংবাদিক রয়েছেন। হত্যা মামলাটিসহ এখন পর্যন্ত মোট ৫টি মামলা হয়েছে।

পড়ুন: চিন্ময় কৃষ্ণের গ্রেপ্তার ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে উদ্বেগ জানালেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কাও

গত শুক্রবার ৩০শে নভেম্বর রাতে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন খুন হওয়া আইনজীবী সাইফুলের ভাই জানে আলম। বিস্ফোরক আইনের এ মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন আবেদনকারী আইনজীবী শুভাশীষ শর্মাসহ জ্যেষ্ঠ অনেক হিন্দু আইনজীবীকে আসামি করা হয়েছে। ওইদিনই নিহত সাইফুলের বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে ৩১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। এছাড়া পুলিশের কাজে বাধাদান, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় হয়েছে আরও তিনটি মামলা।

মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় ইস্যুতেও

৫ই আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সারাপদেশে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে গণগ্রেপ্তারের পর থেকে আদালতে তাদের পক্ষে আইনজীবীদের দাঁড়াতে বাধা দেওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কোনো কোনো আইনজীবী লড়তে চাইলে মারধরের শিকার হয়েছেন প্রকাশ্যে আদালত প্রাঙ্গনেই। আদালতে নেওয়ার সময় আসামিদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।

পড়ুন: হাসপাতালে ঢুকে আসাদুজ্জামান নূরকে হত্যাচেষ্টা

শারীরিক হামলায় গুরুতর আহতদের মধ্যে একজন সাবেক বিচারপতিও রয়েছেন। অসুস্থ আসামিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও তাদের প্রাণনাশের চেষ্টার মত ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষাঙ্গনে ক্লাস করতে বা পরীক্ষা দিতে পারছেন না ছাত্রলীগ কর্মীরা। গেলেই ধরে পিটুনি দিয়ে পুলিশে দেওয়া হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের অধিকাংশের পক্ষে আইনজীবীরা মামলা লড়তে পারছেন না। আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধেও দেওয়া হয়েছে মামলা।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রধান বিচারপতি এই আসামিদের পক্ষে লিগ্যাল এইডের আইনজীবী নিয়োগের কথা বলেন। একইসাথে বিচারক ও আইনজীবীদের নিরাপত্তাসহ দেশের সব আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদেশ দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

যদিও কিছুদিন আগেই একজন সিনিয়র বিচারপতি ৮ বছর আগের একটি মামলার রায়ের অবজার্ভেশনে করা মন্তব্যের জেরে খোদ এজলাসেই হামলার শিকার হন। তাকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করা হয় তার ওপর ডিম ছুড়ে। খোদ আইনজীবীরাই এই ন্যাক্কারজনক কাজটি করেন।

পড়ুন: ৮ বছর আগের রায়ের জেরে বিচারপতিকে ডিম ছুড়ে মারলেন আইনজীবীরা

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতে আসামির পক্ষে আইনজীবী উপস্থিত হতে না দেওয়া তার আইনি অধিকার লঙ্ঘন করা।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এহসানুল হক সমাজী বলেন, যদি উনি (চিন্ময় কৃষ্ণ) প্রপারলি ডিফেন্ডেড না হন, যদি ওনার পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া না হয় তার অর্থ তার আইনগত অধিকার ব্যাহত হচ্ছে। সেজন্য প্রধান বিচারপতির নির্দেশ অনুযায়ী চিন্ময় কৃষ্ণের আইনজীবীরা নিরাপত্তার অভাববোধ করলে উচ্চ আদালতকে এবং প্রধান বিচারপতিকে জানাতে পারেন। চিন্ময় কৃষ্ণের পক্ষে আইনজীবী দাঁড়াতে না পারলে লিগ্যাল এইডের আইনজীবী নিয়োগ করা যাবে।

এহসানুল হক সমাজী আরও জানান, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি অবশ্যই রেকর্ডেড থাকা উচিত।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত এক ব্রিফিংয়ে উপ-মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল বাংলাদেশে এভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গে বলেছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করা প্রয়োজন।

বেদান্ত প্যাটেলকে ব্রিফ করা হয়, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বাংলাদেশে ইসকনের ধর্মগুরু। ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের প্রস্তাবিত পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডও একই সংগঠনের সদস্য। চিন্ময় কৃষ্ণকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছে এবং কোনো আইনজীবী তার পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে পারছেন না, কারণ তার আইনজীবীদের মারধর করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেবে কি না?

জবাবে বেদান্ত প্যাটেল বলেন, আমরা এসব ব্যাপারে জোর দিয়ে যাচ্ছি এবং ইতোমধ্যেই জোর দিয়েছি, যারা আটক আছে তাদের পক্ষেও উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব করতে দিতে হবে এবং মৌলিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের সাথে আচরণ করা প্রয়োজন।

এসময় বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর চলমান সহিংসতার ব্যাপারেও মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।

বেদান্ত বলেন, আমরা স্পষ্ট করেছি, মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান থাকা দরকার। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া দরকার। সরকারকে আইনের শাসনকে সম্মান করতে হবে। এর অংশ হিসেবে মৌলিক মানবাধিকারকে সম্মান করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা গুরুত্বারোপ করে যাবো।

প্রসঙ্গত, আইনজীবীদের বাধা প্রদানের কারণে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে জামিন শুনানির জন্য আদালতে হাজির করা হয়নি। এর ফলে জামিন আবেদন শুনানি একমাস (২রা জানুয়ারি, ২০২৫) পিছিয়ে দিয়েছে চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ আদালত।

Visited 60 times, 1 visit(s) today