❐ বিশেষ প্রতিবেদক
কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আবারও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বর্তমানে কমপক্ষে ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে এই ক্যাম্পগুলোতে। মাদক চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মানবপাচারসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে।
একই সঙ্গে এই ক্যাম্পগুলোতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক বিস্তারের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন টিটিপির সাথে সম্পৃক্ত এক তরুণকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ভয়াবহ তথ্য।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) অহিদুর রহমান বলেছেন, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই সশস্ত্র গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে নিহত হন রোহিঙ্গা হাসান আহমেদ ওরফে ডাকাত কালা হাসান (৪৫)।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত হাসান ডাকাত বাহিনীর ‘জকির গ্রুপের’ সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
টেকনাফে আটক রোহিঙ্গা তরুণের ফোন থেকে পাকিস্তানি জঙ্গি নেটওয়ার্কের ভয়াবহ তথ্য উদ্ধার
সৌদিতে থাকা ২২ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে, দেওয়া হবে বাকিদেরও
এর আগে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৮ ইস্ট এলাকায় নবী হোসেনের নেতৃত্বাধীন আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে গোলাগুলিতে দুই রোহিঙ্গা গুলিবিদ্ধ হন।
গত ৬ই মে একই ক্যাম্পের পশ্চিম এলাকায় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন মোহাম্মদ কামাল (৩৫), যিনি ছিলেন আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির (এআরএ) সক্রিয় সদস্য এবং সশস্ত্র গ্রুপের সদস্য নবী হোসেনের ভাই। মাঝির দায়িত্বও পালন করতেন তিনি।
তার মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে ৫ই মে ক্যাম্প-৭ এলাকায় গুলিতে নিহত হন আরাকান রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের (এআরও) কমান্ডার কেফায়েত উল্লাহ হালিম। কেফায়েত আগে একটি প্রভাবশালী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থেকে পরে আলাদা সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন।
তার এই পদক্ষেপের পর থেকেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
সক্রিয় গোষ্ঠীগুলো: আরসা থেকে ইসলামী মাহাজ
রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আরসা, আরএসও, আরাকান রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন (এআরও), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) এবং ইসলামী মাহাজসহ কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
ক্যাম্পে একসময় প্রায় ১০টি গোষ্ঠীর তৎপরতা ছিল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে সেগুলো কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে সম্প্রতি কারামুক্ত কয়েকজন শীর্ষ নেতা আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ক্যাম্প-৮-এর একজন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকার পর আবারও হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে। এতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর অনেকেই ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা: আরো ৫ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের জন্য অপেক্ষমান
রোহিঙ্গা প্রকল্পের অর্থে প্রতিমন্ত্রীর পিএস-এপিএসদের ফ্রান্স-ইতালি-তুরস্ক সফর
রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে ৭টি গুপ্ত পথ দিয়ে দেশে ঢুকছে বিপুল অস্ত্র
গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা অন্তত সাতটি গুপ্ত পথ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে ঢুকছে। তদন্তে উঠে এসেছে—এই চোরাচালান নেটওয়ার্কে অন্তত পাঁচটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়, আর প্রতিটি চক্রেই রয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা। এসব অস্ত্র মূলত রোহিঙ্গা শিবির এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও মিয়ানমার থেকে এভাবে অস্ত্র আসা নজরে পড়েনি। এখন মাদক পাচারের পাশাপাশি অস্ত্র পাচারও ব্যাপক আকার নিচ্ছে। এমনকি কিছু মানবপাচারকারী চক্রও এই অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে।
সীমান্তঘেঁষা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পাচারকারীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার থেকে আনা অস্ত্র সেখানে পৌঁছানোর পর খুব সহজেই অপরাধীদের হাতে চলে যাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে অস্ত্র দেশে প্রবেশের পর তা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মজুত করা হয়। মাঝে মাঝে অভিযানে অল্প কিছু অস্ত্র ধরা পড়লেও বড় চালানগুলো রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের মধ্যে সাতটি গুপ্ত পথ দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান হচ্ছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো হলো—নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের বাইশফাঁড়ি এলাকা, বালুখালী কাস্টমস ঘাট, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন এবং হোয়াইক্যংয়ের নলবনিয়া অঞ্চল।
জুলাই আন্দোলনের পুরস্কার হিসেবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে তাদেরই ভোট ঠেকাতে ব্যস্ত ড. ইউনুসের সরকার
দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্প ছেড়ে আসা রোহিঙ্গাদের অব্যাহত অস্থিতিশীলতা
বিশেষ করে বাইশফাঁড়ি এলাকা দুর্গম ও পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় এই পথটি পাচারকারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত।
জানা গেছে, এখানকার কিছু চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নৃগোষ্ঠীর সদস্যও অস্ত্রপাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত। এই রুট দিয়েই বেশিরভাগ অস্ত্র পৌঁছে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে।
অন্যদিকে নাফ নদী ব্যবহার করে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা—যেমন হোয়াইক্যংয়ের উনচিপ্রাং, উলুবনিয়া, হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা, দমদমিয়া, জাদিমুরা, নয়াপাড়া এবং টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বরইতলী খাল দিয়েও অস্ত্র পাচার হচ্ছে।
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, এসব রুটের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে। তবে জাদিমুরা পয়েন্টে স্থানীয় এক ব্যক্তি, কালু নামে পরিচিত, রোহিঙ্গা চক্রের সঙ্গে যৌথভাবে এই অবৈধ ব্যবসায় যুক্ত রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাহাড়ি অরণ্যে সক্রিয় এক বৃহৎ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও এই অস্ত্র পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। তাদের সদস্যসংখ্যা শতাধিক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
র্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে।
তার ভাষ্য, গত দেড় বছরে র্যাব-১৫-এর অভিযানে ২১টি বিদেশি অস্ত্র ও ১,২৭৯টি দেশি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে, পাশাপাশি ১৬৩ জন অস্ত্রধারীকে আটক করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংযোগ: উর্দুতে বার্তা, রিমান্ডে আসামি
রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বের সুযোগে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ৫ই মে দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ টেকনাফের ২৪ নম্বর লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ১৯ বছর বয়সী রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ উল্লাহকে আটক করে।
টেকনাফ থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আটকের পর মোহাম্মদ উল্লাহর মোবাইল ফোনে একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর (তেহরিক-ই-তালেবান-পাকিস্তান বা টিটিপি) হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সংযুক্ত থেকে উর্দু ভাষায় বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য উদ্ধার করা হয়েছে।
সে টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের সাব ব্লক-সি-২-এর ৮৯ নম্বরের আবদুল করিমের ছেলে।
টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক মো. বেলাল হোসেন বাদী হয়ে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নম্বর-১৫-০৫-০৫-২৬ ও জিআর-৩৩৭/২৬)। মামলায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া আরসার ছাত্র ও সামরিক শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শুভ মিত্র তালুকদার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মামলার নথির সঙ্গে সংযুক্ত করে আদালতে রিমান্ডের আবেদন করেন।
কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ গত ১২ মে মঙ্গলবার শুনানি শেষে আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ভুয়া পরিচয়ে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট: অনুসন্ধানে উঠে আসছে দালালচক্রের চক্রান্ত
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হুমকির মুখে: সশস্ত্র বিদ্রোহ ও আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ
জঙ্গি অর্থদাতা গ্রেপ্তার: বিদেশি মুদ্রা ও জাল সনদসহ আটক
উখিয়ায় সশস্ত্র সংগঠনের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে মোহাম্মদ তোহাকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা আটক করেছেন।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া পুলিশ ক্যাম্পের আওতাধীন ক্যাম্প-১/ইস্টের ডি-৫ ব্লকের বাসিন্দা তোহাকে আটক করা হয়।
ক্যাম্পের হেড মাঝির উপস্থিতিতে তল্লাশিতে তার কাছ থেকে বাংলাদেশি নগদ ৫৩ হাজার টাকা, সৌদি রিয়াল তিন হাজার ২৫০, মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত তিন হাজার ৩০০ এবং ৬০০ মার্কিন ডলার উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জাতীয় সনদ, তার মেয়ের জন্ম সনদ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একটি চেক বইয়ের পাতা, একটি ভিভো মোবাইল ফোন ও অনলাইন জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় উখিয়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের (১৯৭৪-এর ২৫বি(এ)/২৫ডি ধারাসহ দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায়) মামলা দায়ের করা হয়েছে।
যেভাবে ভাঙছে শৃঙ্খলা
সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মানতে অনীহা দেখাচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। বিশেষ করে রেশন কার্ড আপডেট, ঘর মেরামত বা জরুরি সেবার টোকেন সংগ্রহের সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায়ই তর্কে জড়াচ্ছে তারা। নিয়মবহির্ভূত সুবিধা না পেলে কর্মকর্তাদের হেনস্তা করার চেষ্টাও করছে কেউ কেউ, যা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উখিয়ার কুতুপালং (ক্যাম্প-১ ও ২) এবং বালুখালী (ক্যাম্প-৯ ও ১০) এলাকায় এই শৃঙ্খলাহীনতা সবচেয়ে প্রকট। সম্প্রতি এসব ক্যাম্পের সিআইসি (ক্যাম্প ইনচার্জ) কার্যালয়ের সামনে রেশন কার্ডের ডিজিটাল এন্ট্রি এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা যাচাইকালে একদল রোহিঙ্গা উত্তেজিত হয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে। উদ্বেগজনকভাবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেও তাদের মধ্যে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা দেখা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন ক্যাম্পের একাধিক স্বেচ্ছাসেবক জানান, আগে রোহিঙ্গারা প্রশাসনের কথা মানত, এখন অনেকেই কথা মানতে চায় না। সিআইসি অফিসের লোকজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করাটা যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেশন কমেছে, বেড়েছে হাহাকার
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কর্তৃক মাসিক রেশন বরাদ্দ হ্রাসের পর থেকেই ক্যাম্পগুলোতে ক্ষোভ ও হাহাকার তৈরি হয়েছে এবং এই মানবিক সংকটকে পুঁজি করে সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে।
ডব্লিউএফপি সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ সহায়তা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে — সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ পাচ্ছেন মাসে মাত্র ৭ ডলার, প্রায় ৩৩ শতাংশ পাচ্ছেন ১২ ডলার (বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩ ডলারসহ) এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ পাচ্ছেন ১০ ডলার করে।
কুতুপালং ৪ নম্বর বর্ধিত ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ কেফায়াত বলেন, “মানুষ যখন না খেয়ে থাকে, তখন অনেকেই বাধ্য হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। এতে করে ক্যাম্পের ভেতরে চুরি-ডাকাতি ও নানা অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। দিন যত যাচ্ছে, মানুষের কষ্ট তত বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।”
রোহিঙ্গা নেতা হাফিজুর রহমান বলেন, “পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। মানুষ যখন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে না, তখন তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়।”
কুতুপালং ১ নম্বর (ওয়েস্ট) ক্যাম্পের ডি/৮ ব্লকের রোহিঙ্গা নেতা হামিদ হোসেন বলেন, “রেশন কার্ডের এন্ট্রি নিয়ে কিছু মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে উত্তেজিত আচরণ করে। ক্যাম্পে যেসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিরা নিয়ম-শৃঙ্খলা মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
কাঁটাতারের বেড়া এখন অর্থহীন: ২০০ অবৈধ পথ
ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরেকটি বড় ফাঁকফোকর হলো কাঁটাতারের বেড়া কেটে অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাম্পের বিভিন্ন অংশে বেআইনিভাবে দুই শতাধিক ছোট-বড় প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে অনেকেই নিয়ম ভেঙে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পথ ব্যবহার করে কিছু রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ স্থানীয় এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।
শফিউল্লাহ কাটা ১৬ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মনির উল্লাহ ওরফে মনিয়া বলেন, “কাঁটাতারের বেড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অনেকেই বিকল্প পথ হিসেবে বেড়ার বিভিন্ন জায়গায় ফাঁক তৈরি করেছে।”
গত ৮ই ফেব্রুয়ারি উখিয়ার বালুখালী ও আশপাশের এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৬ শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়েছিল, যারা বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বসবাস করে আসছিলেন।
অভিযান পরিচালনাকারী সেনাবাহিনীর ৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর আহসানুল হাই সৌরভ সে সময় জানিয়েছিলেন, ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে আটক করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে ছড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক ও মেরিন ড্রাইভ এলাকায় চেকপোস্ট সক্রিয় রেখে নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানান।
বনধ্বংস, অপহরণ ও ডাকাত দলের উত্থান
রাতের আঁধারে বন থেকে কাঠ কাটা এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বাধা দেওয়াও এখন ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার নিত্যচিত্র হয়ে উঠেছে। পালংখালী বনবিট কর্মকর্তা জানান, ক্যাম্পসংলগ্ন বনাঞ্চলে রাতের আঁধারে কাঠ কাটার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নিয়মিত টহল ও অভিযান চালিয়ে এই কার্যক্রম ঠেকানোর চেষ্টা হলেও অনেক সময় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এর বাইরে টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বেশ কিছু ডাকাত দলের উপস্থিতির কথাও জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, এসব গোষ্ঠীর একটি অংশ মাদক পাচার, চাঁদাবাজি ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ হয়, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
স্থানীয়দের নিরাপত্তাহীনতা: মানবিক সহানুভূতি থেকে ভয়ের বাস্তবতায়
২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার সময় উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় মানুষ মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন — খাবার ভাগ করে দেওয়া, নিজের আঙিনায় আশ্রয় দেওয়া — সে চিত্র আজ অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে কিছু রোহিঙ্গা চক্র অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নয়, ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারাও এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা। টেকনাফ ও উখিয়ার মোট স্থানীয় জনসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ, অথচ ৩৩টি ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায় বসবাস করছেন প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রা গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
নিরাপত্তা জোরদার, তবে স্থায়ী সমাধানের প্রশ্ন
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সম্প্রতি বিশেষত ক্যাম্প-২, ৬, ৭, ৮ ইস্ট, ১৪ ও ১৫ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে তিন ব্যাটালিয়ন এপিবিএন নিয়োজিত রয়েছে। পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফ থানার পুলিশ এবং র্যাবের নিয়মিত টহলও রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা নেতারা বলছেন, প্রত্যাবাসন ইস্যু সামনে এলেই কিছু গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। তাদের মতে, মাদক ও অস্ত্র কারবারের সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে তিন শতাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
